কোথায় গেল ১০ হাজার পড়ুয়া?প্রশ্ন করছে প্রান্তিক পুরুলিয়া
বুদ্ধদেব পাত্র
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে কার্যত অর্ধেক হয়ে গেল রাজ্যের প্রান্তিক জেলা পুরুলিয়ায়। গত বছর পুরুলিয়ায় উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৬৫৬ জন। এবছর পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১৯হাজার ৪০৯ জন। বিষয়টি সামনে আসায় শোরগোল শুরু হয়েছে জেলা পুরুলিয়ায়।উঠে আসছে স্কুলছুটের তৃত্ত্ব বা ড্রপ আউট। যদিও তা মানতে নারাজ জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) মহুয়া বসাক। তিনি বলেন, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যা অনেকটাই কম ছিল। তারই প্রভাব এবারের উচ্চ মাধ্যমিকে পড়েছে।বিষয়টির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পুরুলিয়া জেলার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার জয়েন্ট কনভেনর জ্যোতির্ময় ব্যানার্জি বলেন, প্রি-প্রাইমারিতে ভর্তি হতে গেলে বয়স পাঁচ বছরের বেশি হতে হবে-এই সংক্রান্ত একটি নিয়ম চালু করা হয় ২০১৩ সালে। সেই নিয়মের গেরোয় ওই বছর প্রি প্রাইমারিতে ভর্তির সংখ্যা কমে। তার ফলে ২০২৩ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও রাজ্যজুড়ে এক লাফে কমে। ২০২৩ সালে যারা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে, তারাই এবছর উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছে। তাছাড়া অনেকেই কারিগরি শিক্ষার দিকেও ঝুঁকেছে। সেই কারণেই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা কমেছে।তা বলে পড়ুয়ার সংখ্যা এক ধাক্কায় কমে অর্ধেক? পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল ২৯হাজার ২২২ জন পড়ুয়া। সেই হিসেব ধরলেও তো প্রায় ১০ হাজার পড়ুয়া কমেছে এবছর। যদিও পর্ষদের ব্যাখ্যা, মধ্যমিকের পর অনেকেই আইটিআই বা অন্যান্য কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি হয়। তাই এবছর পড়ুয়া কমেছে! তবে, এই তত্ত্ব মানতে নারাজ শিক্ষাবিদদের একাংশ। তাঁদের দাবি, পারিবারিক সমস্যা, সংসারে আর্থিক প্রতিবন্ধকতা থেকে শুরু করে নানাবিধ কারণে মাধ্যমিকের পরেই স্কুল ছাড়ে বহু পড়ুয়া। তারপর কেউ বাইকের গ্যারেজে, মুদির দোকানে, জনমজুর কিংবা কাজের সন্ধানে ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হয়েও পাড়ি দিয়েছে বলছেন শিক্ষক তথা বিজেপি নেতা নীলোৎপল সিংহ।
রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠের শিক্ষক স্বরূপ ধবল জাজবাত ২৪ কে জানান। উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী কমার একটাই কারণ তা হলো কর্মসংস্থান। কর্মসংস্থানের অভাব বুঝেই ছাত্রছাত্রীরা উচ্চ মাধ্যমিকের থেকে মুখ ফিরিয়ে কারিগরি শিক্ষার দিকে ছুটছে। এছাড়া শিক্ষক বদলি হয়ে চলে যাওয়ার কারণে বহু স্কুলে শিক্ষকের শূন্যতা দেখা দিয়েছে। অনেক বিষয়ে শিক্ষক নেই।সেটাও একটা কারণ। অনেক শিক্ষক আবার জানাচ্ছেন পড়ার প্রতি আগ্রহ কমছে পড়ুয়াদের। কারণ পড়াশোনা করে যে তারা চাকরি পাবেই, সেই নিশ্চয়তা নেই। বিজেপির কটাক্ষ, আগে পাড়ার শিক্ষিত চাকরিজীবীদের দেখে ছেলেমেয়েরা উদ্বুদ্ধ হতো। কিন্তু, এখন যেদিকে তাকাচ্ছে ,শুধুই বেকার। তাই পড়ুয়ারাও লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে।
শিক্ষক তথা বিজেপি নেতা নিলোৎপল সিংহকে কাউন্টার করে পুরুলিয়া জেলা তৃণমূল শিক্ষাসেলের(মাধ্যমিক) আহবায়ক বিকাশ মাহাত, বলেন। না জেনেই মন্তব্য বা কুৎসা করা বিরোধীদের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসল কারণ হল,”রাইট টু এডুকেশন বা শিক্ষার অধিকার আইন অনুযায়ী ২০১৩ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে সারা রাজ্য জুড়েই বয়স ভিত্তিক শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই বছরের ১লা জানুয়ারির হিসেব প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির ন্যুনতম বয়স ছিল ৬ বছর। বয়স সংক্রান্ত সেই নিয়মের জেরে সেবছর প্রথম শ্রেণিতে ভর্তির সংখ্যাটা অনেক কম ছিল। ২০১৩ তে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া সেই পড়ুয়ারাই ২০২৩ সালে মাধ্যমিক পাশ করে আর চলতি বছর ২০২৫ এ তারাই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে চলেছে। সেই কারণে ২০২৩ সালে মাধ্যমিকে অনেক কম ছাত্র ছাত্রী পরীক্ষায় বসে কিন্তু পরের বছর থেকে স্বাভাবিক প্রবণতা বজায় থাকে।”
এবছর পুরুলিয়া জেলায় ১৯ হাজার ৪০৯জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রের সংখ্যা ৯ হাজার ৬০০ জন। ছাত্রীর সংখ্যা ৯ হাজার ৮০৯ জন। এবছর মোট পরীক্ষা কেন্দ্র থাকছে ৮৫টি। এরমধ্যে মেন ভেনু থাকছে ৪০টি। সাব ভেনু থাকছে ৪৫টি। পরীক্ষার্থীরা যাতে ইলেকট্রনিক্স ডিভাইস নিয়ে কেন্দ্রে না ঢুকতে পারে তার জন্য পরীক্ষা কেন্দ্রের প্রবেশদ্বারে থাকছে মেটাল ডিটেক্টরের ব্যবস্থা। জেলায় সুষ্ঠুভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সম্পন্ন করতে আধিকারিকরা সবরকম চেষ্টা করছেন বলে জানালেন জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক মহুয়া বসাক।
