অভিজিৎ বসু
বিধানসভা নির্বাচনের আগেই একাধিক ইস্যু আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে এই বাংলায়। তবে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যত আলোচনাই হোক না কেনো তার একটা বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এই সংখ্যালঘু ভোট। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে যে কোনও নির্বাচনের আগেই কেন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে এই মুসলিম ভোটের বিষয়টি? সেটা একবার বুঝে নেওয়া দরকার। মুসলিম ভোটই ঠিক করে দেয় বাংলার কুর্শীতে কে বসবেন আর কে বসবেন না সেটা। বাংলার জনসংখ্যার নিরিখে প্রতি চারজনের মধ্যে একজন মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ। ফলে ভোটবাক্সে তাদের গুরুত্ব ঠিক কতটা, তা এই একটি পরিসংখ্যানই বুঝিয়ে দেয়। ২০১১ সালের শেষ আদমসুমারি অনুযায়ী, ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের বিচারে ৩ নম্বরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। বাংলা বাদে কেবল অসম আর জম্মু-কাশ্মীরে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি। আর সেই কারণেই নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক দল থেকে বিশেষজ্ঞ, সবাইকে সংখ্যালঘু ভোটের দিকে নজর রাখতে হয়। বিগত দিনের তথ্য বলছে, সাড়ে তিন দশকের বাম জমানার শেষের দিকটা বাদ দিলে বাংলার সংখ্যালঘু মানুষ ভোটের বাক্সে বামেদের পাশেই থেকেছেন বলেই নিশ্চিন্তে নিরাপদে রাজত্ব চালিয়ে গেছেন জ্যোতি বসু। একদম গটমট করে হেঁটে মহাকরণ থেকে রাজ্য চালিয়েছেন এই সংখ্যালঘুদের ভোট পেয়েই।
কিন্তু সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম পর্ব চলাকালীন ২০০৮-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে প্রথম প্রমাণ মেলে, সংখ্যালঘু ভোটাররা যে বামেদের থেকে একটু একটু করে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছেন। সেই থেকেই মালদহ-মুর্শিদাবাদের মতো জেলা বাদে অন্য সব জায়গায়, সংখ্যালঘু ভোটে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে তৃণমূল। আর সেই আধিপত্যকে সম্বল করেই সেই সংখ্যালঘুদের মন রক্ষা করেই প্রায় ২৪ বা ২৫ শতাংশ ভোট যাদের হাতে সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে শাসক দল বা সরকারের ক্ষমতায় থাকা একটি দল সেটাই স্বাভাবিক। যদিও ২০১১ পর আদমশুমারি হয়নি। সেটা নিয়ে গেলো গেলো রব তুলে মোয়াজ্জেম ভাতা নিয়ে হৈ চৈ হুল্লোড় করে কোনো লাভ নেই। যে গরু দুধ দেয় তার লাথিও ভালো। আর সেটা মেনেই ফের ২০২৬ এর বিধানসভা ভোটের এক বছর আগেই বিজেপির সঙ্গে টক্কর দিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবার সংখ্যালঘু তাসকে আস্তিন থেকে বের করতে চাইছেন। আর তাই দীর্ঘ দশ বছর পর আবার ফের ফুরফুরা শরীফ সফরে যাচ্ছেন তিনি আগামীকাল। যাতে ফের তৃতীয় বারের পর চতুর্থ বার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দখল করে রাজ্যে শাসন ক্ষমতায় ফিরতে পারে শাসক দল তৃণমূল। বামেরা এখন তো অস্তমিত সূর্য। বিজেপির হিন্দুত্ব হিন্দুত্ব প্রচার অভিযান চলছে রাজ্য জুড়ে। এইসবের মাঝে সখ্যালঘুদের ভোট ব্যাংককে ধরে রাখতে পারলেই কেল্লা ফতে। আর সেই উদ্দেশ্যে নিয়েই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই রমজান মাসে ফুরফুরা সফর করছেন বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। বামেদের রাজত্বের শেষ ভাগে সেই মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এর বিখ্যাত উক্তি বেআইনি মাদ্রাসা হলো সন্ত্রাসের স্থান বা আঁতুড় ঘর। যা বলে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে যান তৎকালীন বাম সরকারের প্রয়াত মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। আর তারপর তো সবটাই ইতিহাস। তাসের ঘরের মতই ভেঙে পড়ে যায় বাম সরকারের শক্ত ইমারত।
কিন্তু, এ বার কী হবে, সেটা বড় প্রশ্ন। ভোটের রাজনীতিতে বিজেপির অস্তিত্ব আজ বেশ প্রকট। সারা দেশের দিকে নজর রাখলেও দেখা যায় দু-একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে স্বাধীনতার পর থেকে সংখ্যালঘুরা কংগ্রেসের মতো দলগুলিকেই ভোট দিয়েছেন। তারপর সংখ্যালঘুদের আশীর্বাদ পেয়েছে বামেরা। আর তারপর এই মা মাটি মানুষের সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল সরকার। পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে এখন হিন্দু আর মুসলিম। সেই ভাগাভাগি ভোট রাজনীতিতে এখন হিন্দু না মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন। সেই লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে চলছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আর তাই সেই সংখ্যালঘুদের মন জয় করতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মাস্টার স্ট্রোক। যাতে তিনি এইবারও বিধানসভা ভোটের বৈতরণী পার হয়ে যান এই সংখ্যালঘুর টেক্কা খেলেই।
