ব্রেন ক্যান্সার মানবদেহের অন্যতম জটিল এবং বিপজ্জনক রোগগুলির মধ্যে একটি। এটি মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক কোষ বৃদ্ধির কারণে সৃষ্টি হয়, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপে বিঘ্ন ঘটায়। ব্রেন ক্যান্সার দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করা হলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ চিহ্নিত করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই এই রোগ সম্পর্কে সচেতনতা এবং প্রাথমিক লক্ষণ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি।
ব্রেন ক্যান্সারের লক্ষণ সাধারণত মস্তিষ্কের কোন অংশটি আক্রান্ত হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে। এই রোগের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ হচ্ছে তীব্র মাথাব্যথা। বিশেষ করে সকালে ঘুম থেকে উঠে মাথাব্যথা শুরু হলে এবং তা ওষুধ খাওয়ার পরেও না কমলে তা ব্রেন ক্যান্সারের লক্ষণ হতে পারে। এছাড়া ঘন ঘন বমিভাব বা বমি হওয়া, বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই মাথা ঘোরা এবং ভারসাম্যহীনতা ব্রেন ক্যান্সারের ইঙ্গিত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা চোখে ঝাপসা দেখা, দ্বৈত দৃষ্টি বা হঠাৎ করে দৃষ্টিশক্তি হারানোর মতো সমস্যার সম্মুখীন হন।
ব্রেন ক্যান্সারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হল শ্রবণশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া। এক বা দুই কানে কম শোনা, কানে বাজা বা অবিরত শোঁ শোঁ শব্দ হওয়া এই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। শরীরের একপাশে দুর্বলতা, হাত বা পায়ে অসাড়তা এবং সংবেদনশীলতার অভাবও ব্রেন ক্যান্সারের লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রোগীরা মস্তিষ্কে বিভ্রান্তি, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং মনোযোগের অভাব অনুভব করেন। কথার মধ্যে অস্পষ্টতা, শব্দ গুছিয়ে বলতে না পারা এবং হঠাৎ করে কথা বলতে অসুবিধা হওয়া ব্রেন ক্যান্সারের লক্ষণগুলির মধ্যে অন্যতম।
এই রোগের কারণ এখনও পুরোপুরি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বংশগত কারণ, অতিরিক্ত রেডিয়েশনের সংস্পর্শ, রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শ এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন ব্রেন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। ধূমপান এবং মাদক সেবন এই রোগের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ইমিউন সিস্টেমের সমস্যাও ব্রেন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ব্রেন ক্যান্সার নির্ণয়ের জন্য আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিভিন্ন পরীক্ষার ওপর নির্ভর করা হয়। এমআরআই (MRI), সিটি স্ক্যান (CT Scan), বায়োপসি এবং নিউরোলজিক্যাল পরীক্ষা এই রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। রোগটি কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কতটা ছড়িয়ে পড়েছে তা নির্ভর করে চিকিৎসা পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়। অস্ত্রোপচার, রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি এবং টার্গেটেড থেরাপি ব্রেন ক্যান্সার চিকিৎসার প্রচলিত পদ্ধতি। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হলে অস্ত্রোপচার এবং অন্যান্য চিকিৎসা সহজ হয়।
ব্রেন ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা এবং সঠিক জীবনযাপন অত্যন্ত জরুরি। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত ঘুম এই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। ধূমপান এবং মাদক সেবন এড়িয়ে চলা, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে।
ব্রেন ক্যান্সার একটি জটিল এবং মারাত্মক রোগ হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে লক্ষণগুলি চিহ্নিত করা গেলে এবং দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেড়ে যায়। তাই উপরের লক্ষণগুলির মধ্যে কোনোটি দেখা গেলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো চিকিৎসা এবং সচেতনতা এই রোগ প্রতিরোধ ও নিরাময়ের প্রধান চাবিকাঠি।
