সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
দলে মোট বিধায়ক ২২৭। অথচ বিধানসভা অধিবেশনের শেষ দিনে দলীয় হুইপ জারি থাকা সত্ত্বেও হাজির মাত্র ৭০! দলনেত্রীর নির্দেশ অগ্রাহ্য করার পর্দা কোথা থেকে পেলেন শাসকদলের সিংহভাগ বিধায়ক? যেখানে ধলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই গোটা বিধানসভাকে গণতন্ত্রের পাঠ দিয়েছিলেন আর তার দলেরই বিধায়কেরা অমান্য করে এই নজির তৈরি করলেন! এ ঘটনায় যথেষ্ট অস্বস্তিতে রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তথা তৃণমূল পরিষদীয় দল। বিশেষ করে পরিষদীয় দল এবং বিধানসভার শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির ভূমিকা যখন প্রশ্নের মুখে ঠিক তখনই গরহাজিরার কারণ খতিয়ে দেখে গরহাজির থাকা বিধায়কদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করতে বিশেষ বৈঠকে বসলো শাসকদলের বিধানসভার শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি।
সদ্যসমাপ্ত বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে বিরোধী পক্ষকে গণতন্ত্রের পাঠ দিয়েছেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ এই অধিবেশনের শেষ দুই দিনে তারই নির্দেশে জারি করা দলীয় হুইপ অমান্য তারই দলের সিংহভাগ বিধায়ক। আর এখানেই অস্বস্তি বেড়েছে তৃণমূল পরিষদীয় দল এবং শীর্ষ নেতৃত্বের। কেন এমনটা হল? তা নিয়েই এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন শীর্ষ নেতৃত্ব। চলতি বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয় পর্বের দফাবারি বাজেট আলোচনা শেষ হয় ২০ মার্চ। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে ১৯ ও ২০ তারিখ দলের সব বিধায়ককে হাজির থাকতে জারি করেন তৃণমূলের পরিশোধীয় দলের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ। প্রথম দিন ১৯ মার্চ মমতা নিজেই বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন এবং বিধানসভায় তিনি নিজেও বক্তব্য রাখেন। সেদিনই তিনি সংসদীয় রাজনীতিতে বিধানসভা অধ্যক্ষের চেয়ারকে সম্মান জানানো এবং সমস্ত আলোচনা বা বিতর্কে শাসক বিরোধী সকলের অংশ নেওয়ার গুরুত্ব প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে গোটা বিধানসভাকে গণতন্ত্রের পাঠ দেন। অথচ পরের দিন অর্থাৎ ২০ মার্চ দলনেত্রীর নির্দেশ অগ্রাহ্য করে বিধানসভায় গরহাজির ছিলেন শাসক দলের অধিকাংশ বিধায়ক। বিধানসভা সূত্রে খবর, ২০ মার্চ অর্থাৎ গত বৃহস্পতিবার দলীয় হুইপ জারি থাকা সত্ত্বেও বিধানসভায় হাজির ছিলেন শাসকদলের ২২৭ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৭০ জন। উল্লেখযোগ্য, ১৯ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী নিজে বিধানসভায় থাকার ফলে হাজিরা যেমন ফুল হাউস ছিল ঠিক তার পরদিন মুখ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৭০-এ। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি তাপসী মন্ডল বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ায় বর্তমানে তৃণমূলের বিধায়ক সংখ্যা ২২৭। পক্ষান্তরে প্রধান বিরোধীদল বিজেপির বিধায়ক সংখ্যা ৬৫। এছাড়াও আইএসএফের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন। শাসক দলের পক্ষে অস্বস্তি এটাই যে খোদ তৃণমূল নেত্রীর নির্দেশে যখন উইক জারি করা হয়েছে তখন ২২৭ জনের মধ্যে উপস্থিতি মাত্র ৭০ কেন? কেনই বা দলনেত্রী নির্দেশ অগ্রাহ্য করা হলো? যে বিরোধী পক্ষকে গত ১৯ মার্চ বিধানসভায় দাঁড়িয়ে নিজের বক্তব্যে ‘আপনি আচরি ধর্ম’ বলে উপদেশ দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক তার পর দিনই দলের হুইপ অমান্য করে সিংহভাগ শাসকদলের বিধায়কের এই ঘর হাজিরা এবার বিরোধীদের সুযোগ করে দিয়েছে পাল্টা তীর ছোঁড়ার। এই পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি বিধানসভায় শাসকদলের শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি আজ বৈঠকে বসে। কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটলো তা নিয়ে বিধায়কদের জিজ্ঞাসাবাদ এর আগে ১৯ মার্চ এবং ২০ মার্চ কারা কারা বিধানসভায় উপস্থিত ছিলেন আর কারা ঘর হাজির ছিলেন তার তালিকা তৈরি করছেন কমিটির সদস্যরা। রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী শোভন দেব চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে এই শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটিতে রয়েছেন রাজ্যের অর্থ দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, রাজ্যের পুরো ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম এবং রাজ্যের বিদ্যুৎ মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস। সঙ্গে রয়েছেন বিধানসভার শাসক দলের মুখ্য সচেতক নির্মল ঘোষ। শোভন দেব চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন ” দলনেত্রী নির্দেশে উইক করা সত্ত্বেও কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটলো তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনে বিধায়কদের এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে অথবা শাস্তি মূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তবে গোটা বিষয়টা খতিয়ে দেখে আগে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে রিপোর্ট দেয়া হবে এবং আলোচনা করা হবে। নেতৃত্বের পরামর্শ অনুযায়ী দলীয় বিধায়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
