২০২০ তে একটা ফ্লাইটে রিপাবলিকের অর্ণব গোস্বামীকে খোরাক করেছিল কুনাল কামরা। হ্যারাসমেন্টের কেস দিয়েছিল ওর নামে। ইন্ডিগো সহ আরও দুটো ফ্লাইট কোম্পানি ব্যান করে দিয়েছিল কামরাকে। তারপরও কামরা স্পষ্ট ভাবে বলেছিল, আমি ক্ষমা চাইব না। প্লেনে উঠতে না দিলে ট্রেনে করে যাবো। কিন্তু ক্ষমা চাওয়ার কোনও প্রশ্ন নেই। ২০২১ এ সুপ্রিম কোর্টকে নিয়ে একটা খিল্লির ট্যুইট করেছিল। ব্যাস, ক্রিমিনাল কনটেম্পট অফ কোর্টের কেস ঠুকেছিল। ৬ সপ্তাহের সময় দিয়েছিল ক্ষমা চাইতে। নইলে তার ইন্টারনেট পরিষেবা কেটে দেবে রাষ্ট্র। কামরা বলেছিল, জোকস নিড নো ডিফেন্স, কারণ মজা বাস্তব নয়, কমেডিয়ানের মূল্যায়ন মাত্র। এটার জন্য কোর্ট যদি মনে করে আমি বাড়াবাড়ি করেছি আর আমার ইন্টারনেট কেটে দেওয়া উচিত, আমি সেই রায় মাথা পেতে নেব। প্রতি ১৫ই আগস্ট আমিও পোস্টকার্ড লিখে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানাব, ঠিক যেমন মাসের পর মাস ইন্টারনেট ছাড়া আমার কাশ্মীরের বন্ধুরা আমায় জানায়। মাঝে কিছু বছর দেশে কোথাও শো করতে পারেনি। কারণ তার শো আছে শুনলেই চাড্ডিরা গিয়ে বাওয়াল দেয়, ভাঙচুর করে, হুমকি দেয়। পুরো কোনঠাসা করে দিয়েছিল, ভাতে মারতে চেয়েছিল। তাও কোনো ক্ষমাটমা চায়নি সে একদম কোনোদিন। আর গতকাল নাম না নিয়ে খিল্লি করেছিল মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে। ভিডিও বেরোতেই ভ্যেনু ভাঙচুর। ৬-৭ টা এফআইআর ঠুকেছে। দলের নেতারা হুমকি দিয়েছে, ক্ষমা না চাইলে গোটা দেশে কোথাও রাস্তায় বেরোতে পারবে না, বেরোলেই রগড়ে দেবে। কামরা আবারও সপাটে বলে দিয়েছে, ক্ষমা চাওয়ার কোনও গল্পই নেই ।সত্যিই কুনাল কামরা এখন বেশ বাজার গরম করে ফেলেছেন চারিদিকে। বুকের পাটা দেখিয়ে বুক ঠুকে ক্ষমা না চেয়ে বাজার গরম করা।
কুণাল কামরা (জন্ম ৩ অক্টোবর ১৯৮৮) একজন ভারতীয় স্ট্যান্ডআপ কৌতুকাভিনেতা যিনি জীবনের অযৌক্তিকতা নিয়ে তার পর্যবেক্ষণমূলক কৌতুকের জন্য বেশ পরিচিত একটি নাম । তার অভিনয়ের মধ্যে রয়েছে রাজনীতি, ক্যাব চালক, অবিবাহিত জীবন এবং টিভি বিজ্ঞাপন নিয়ে রসিকতা। তিনি জয় হিন্দ কলেজে বাণিজ্য বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন । দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে তিনি প্রসূন পান্ডের বিজ্ঞাপন চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা করকোয়েস ফিল্মসে প্রযোজনা সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন, যেখানে তিনি এগারো বছর কাজ করেন। ২০১৩ সালে মুম্বাইয়ের ক্যানভাস লাফ ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি একজন স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান হিসেবে অভিনয় শুরু করেন। ২০১৭ সালে ইউটিউবে আপলোড করা তার একটি অনুষ্ঠানের ক্লিপ ভারতীয় অতি-জাতীয়তাবাদের উপর ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির জন্য তাকে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়। তিনি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে রমিত ভার্মার সাথে তার টক-শো ” শাট আপ ইয়া কুনাল” শুরু করেন। ১ মার্চ ২০১৭ তারিখে, তিনি ইউটিউবে “দেশপ্রেম এবং সরকার” শিরোনামে একটি কমেডি ভিডিও প্রকাশ করেন যেখানে ভারতীয় নোট বাতিল , সরকার এবং সেনাবাহিনীর প্রতি ভারতীয়দের মনোভাব নিয়ে উপহাস করা হয় । ভিডিওটি আপলোড করার জন্য তিনি বেশ কয়েকটি মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালে, তিনি শেয়ার করেন যে “রাজনৈতিক সমস্যার” কারণে তার বাড়িওয়ালা তাকে বাড়ি ছেড়ে দিতে বলেছিলেন। কিন্তু তবু তিনি তাঁর কমেডি করা থেকে সরে আসেননি।
২৮ জানুয়ারী ২০২০ তারিখে, কামরা, ইন্ডিগোর একটি ফ্লাইটে ভ্রমণের সময়, সংবাদ উপস্থাপক অর্ণব গোস্বামীর মুখোমুখি হন এবং তাকে তার সাথে বিতর্কের জন্য আমন্ত্রণ জানান। কামরা জাতীয় বিষয় এবং রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যার বিষয়ে গোস্বামীর কভারেজ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন । কামরা পরে টুইটারে ঘটনার ১.৫১ মিনিটের একটি দীর্ঘ ভিডিও প্রকাশ করেন, যেখানে দেখা যায় যে গোস্বামী তার প্রশ্নের জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছেন। পরের দিন, ইন্ডিগো কামরাকে ছয় মাসের জন্য তাদের ফ্লাইটে চড়তে নিষিদ্ধ করে। একই দিনে, সরকারি মালিকানাধীন বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়া তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে। ভারতের বিমান পরিবহন মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি টুইট করেন যে অন্যান্য বিমান সংস্থাগুলিকেও কামরাকে অনুসরণ করা উচিত এবং একটি উদাহরণ স্থাপন করার জন্য নিষিদ্ধ করা উচিত। পরের দিন, স্পাইসজেট এবং গোএয়ারও তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষিদ্ধ করে। এই নিষেধাজ্ঞাকে অতিরিক্ত এবং বেসামরিক বিমান চলাচল অধিদপ্তরের নিয়মের পরিপন্থী বলে সমালোচনা করা হয়েছিল ।
কামরাকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের কারণে চলচ্চিত্র নির্মাতা অনুরাগ কাশ্যপ ইন্ডিগোর সাথে বিমান চালাতে অস্বীকৃতি জানান। কামরার সমর্থনে দুই ইন্ডিগো যাত্রীও প্রতিবাদ করেন এবং বিমানে প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন। আর এইভাবেই তাঁর প্রতিবাদ ক্ষমা না চাওয়া ছড়িয়ে পড়ে। কামরা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ইন্ডিগোকে ক্ষতিপূরণ দাবি করে একটি আইনি নোটিশ জারি করেন। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে, গুরগাঁওয়ে তার কমেডি শো বাতিল হওয়ার পর , কামরা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) কে সম্বোধন করে একটি খোলা চিঠি লিখেছিলেন । তিনি ভিএইচপিকে মহাত্মা গান্ধীর হত্যাকারী নাথুরাম গডসের নিন্দা করার জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। সেই কুণাল কামরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, শিন্দে-মন্তব্যের জন্য ক্ষমা তিনি চাইবেন না। দাবি করেছেন, তিনি শিন্দেকে নিয়ে যা বলেছেন, একদা অজিত পওয়ার শিবসেনা প্রধানকে তা-ই বলেছিলেন। ক্ষমা চাওয়া তাঁর অভিধানে নেই। রাজনীতির লোকরা যদি সহজ মন্তব্যকে সহজ ভাবে গ্রহণ করতে না পারেন
তাহলে আর তিনি ক্ষমা চাইবেন কেনো শুধু শুধু। এতো কিছুর মাঝে হাত কচলে বেঁচে থাকার মাঝে কিন্তু এই ক্ষমা না চেয়ে হাসি মুখে বেঁচে থাকা কুনাল কামরাও আছেন আমাদের দেশে।
