সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ফের কেন্দ্র বিরোধী অন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জয়। এবার শুধু রাজ্য রাজনীতির নয় গোটা দেশে বিরোধী রাজনৈতিক প্লাটফর্মে অন্যতম বিরোধী নেত্রী হিসেবে এর প্রতিষ্ঠা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ভূয়ো ভোটার বা ভুতুড়ে ভোটার ইস্যুতে প্রকারান্তরে হার মানতে হলো নির্বাচন কমিশনকে। অবশেষে ভোটার তালিকায় ভুতুড়ে ভোটার অথবা ডুপ্লিকেট এপিক কার্ডের অস্তিত্বের কথা সরকারিভাবে মেনে নিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। ইতিমধ্যেই এরাজ্যে ৬০০ ডুপ্লিকেট এপিক কার্ড বাতিল করা হয়েছে যার অধিকাংশ হরিয়ানার সঙ্গে যুক্ত। হরিয়ানাতেও বহু ডুপ্লিকেট এপিক কার্ড বাতিল হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। আগামী ২৮ মার্চ দুপুর তিনটে নাগাদ রাজ্য সিইও দপ্তরে এনিয়ে সর্বদলীয় বৈঠক ডেকেছে নির্বাচন কমিশন।
রাজ্যের ভোটার তালিকায় একই এপিক কার্ড নম্বরে ভিন রাজ্যের ভোটার। তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে নেতাজি ইন্ডোর এর মেগা কর্মী সমাবেশে অভিযোগ তুলেছিলেন মমতা। কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনকেই। উন্নত গুজরাত ও হরিয়ানা এবং পাঞ্জাবের একাংশে এই ধরনের ভোটারের আধিক্য রয়েছে। বলে জানান তৃণমূল নেত্রী। এমন কি মহারাষ্ট্র ও দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনে এভাবেই কার্ড সাজি করে বিরোধীদের পর্যদুস্থ করেছে বিজেপি বলেও সুর চড়ান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রাথমিকভাবে এই ধরনের জালিয়াতি অথবা পক্ষপাত দুষ্টের অভিযোগ। উড়িয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা কর্মীদের অনিচ্ছাকৃত ভুলকেই সামনে তুলে ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ কে পাশ কাটানোর চেষ্টা করে কমিশন। এমনকি কমিশনের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় যে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও অর্থহীন। কিন্তু নাছোড় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভুতুড়ে ভোটার বা টিকেট এপিক কার্ড ইসুকে হাতিয়ার করে রাজ্য তথা জাতীয় রাজনীতিতে নয়া আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন মমতা। একদিকে সংসদের ভিতরে ও বাইরে বিক্ষোভ আন্দোলন অন্যদিকে জাতীয় নির্বাচন কমিশনে দফায় দফায় দলীয় প্রতিনিধিদের পাঠিয়ে চাপ বাড়ানোর কৌশল। একই সঙ্গে রাজ্যের ব্লকে ব্লকে দলীয় কর্মীদের কাজে লাগিয়ে এবং নির্দিষ্ট টাস্ক ফোর্স তৈরি করে এই ইসুকে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার মাস্টার স্ট্রোক দিলেন তৃণমূল নেত্রী। এখানেই ধীরে ধীরে বিপত্তি বাড়তে থাকে নির্বাচন কমিশনের। ভোটের বুথে আধার ও এপিক কার্ড সংযুক্তিকরণের দাবিকে সামনে রেখে তৃণমূলকে চাপে খেলার কৌশল ন্যায় বিজেপি। এমনকি জাতীয় নির্বাচন কমিশনে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে এই ইস্যুতে বৈঠকও হয়। কিন্তু ডুপ্লিকেট ইস্যু পিছু হটা কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন আধার-এপিক সংযুক্তিকরণে হঠকারী হয়ে নয়, আইন মোতাবেক এগোবে বলে জানিয়ে দেয়। পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা তৃণমূল কংগ্রেসের এই ইস্যু যথেষ্ট অস্বস্তিতে ফেলে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনকেও। রাজ্যে রাজ্যে সিইও দপ্তরে এবং সরাসরি জেলায় জেলায় ইলেকশন রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের নির্দেশ পাঠিয়ে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা যাচাই করনে নতুনভাবে নির্দেশ দেয় কমিশন। বলা হয় জেলায় জেলায় সর্বদল বৈঠকের মাধ্যমে এই অস্বচ্ছতা কিভাবে কাটানো যায় তার পরামর্শ নিতে হবে। সেখানে অবশ্যই প্রাধান্য পায় তৃণমূল কংগ্রেস। এমনকি লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিধানসভা ক্ষেত্রগুলির সীমানা পুনর্বিন্যাসে যখন দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোর রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং তা নিয়ে বিএম কে প্রধান তথা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের ডাকা বৈঠকেও সাড়া দেয়নি তৃণমূল। কারণ ভোটার তালিকার এই কারসাজি যে আগামী বছরে পশ্চিমবঙ্গ বিহার সহ চার রাজ্যে বিজেপি বিরোধী দল গুলোর ক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে আনবে তা বিলক্ষণ বুঝতে পেরেছিলেন মমতা। তাই তৃণমূলের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝিয়ে স্ট্যালিনকে জানানো হয় বিধানসভা নির্বাচনের ইস্যু সামলে তারপর লোকসভার ইস্যুতে ঝাঁপাবে তৃণমূল। তাই সংসদের ভিতরে ও বাইরে ভুতুড়ে ভোটার ইস্যুতে কংগ্রেস-ডিএমকে সবাইকে পাশে পায় তৃণমূল। এমনকি বিজেপি বিরোধী রাজ্যগুলোতে কেন্দ্রীয় বঞ্চনসহ ১০০ দিনের কাজের বকেয়া টাকা নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে যে আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে তৃণমূল তাকে সমর্থন জানাতে বাধ্য হয়েছেন রাহুল গান্ধী ও জাতীয় কংগ্রেসও। আর এখানেই বিজেপির বিরোধী রাজনীতিতে ফের নয়া রজনৈতিক জয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। জাতীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত থাকার সুবাদে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং অন্দোলন-লড়াই-সংগ্রাম করে উঠে আসা এই রাজনৈতিক নেত্রীর মানুষের পালস বোঝার ক্ষমতা, যে অন্যান্য বিরোধী নেতৃত্বের থেকে কয়েক কদম এগিয়ে ফের বুঝিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
