এবছর পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্জনের ঘোষণা করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।বুধবার ২৬ মার্চ রাতে চারুকলার ২৬তম ব্যাচের (চারুকলা ৭০) শিক্ষার্থীদের পাঠানো এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। রাইজিং বিডির তথ্য অনুযায়ী বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেছেন, “অনুষদে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, ছাত্র প্রতিনিধি কারো সঙ্গে কোনো পূর্ব আলোচনা ছাড়াই এবারের নববর্ষের আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এবারের বৈশাখের আয়োজনের সঙ্গে আমাদের কোনো প্রকার সম্পৃক্ততা নেই।”
গত ২৫ মার্চ মঙ্গলবার প্রয়াত হয়েছেন বাংলাদেশের বর্ষীয়ান সঙ্গীতশিল্পী তথা ‘ছায়ানট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সনজীদা খাতুন।প্রতি বছর ঢাকা শহরে পয়লা বৈশাখের ভোরে মঙ্গল শোভযাত্রা আর ছায়ানটের সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে একে অপরের সঙ্গে জড়িত।এবার সেই মঙ্গল শোভযাত্রার আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা।
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী বিবৃতিতে তারা আরো বলেছেন, “শোভাযাত্রায় বানানো স্ট্রাকচারের ডিজাইন ও আইডিয়া সম্পূর্ণ শিক্ষকদের দেওয়া, চারুকলার আপামর সাধারণ শিক্ষার্থী এর সঙ্গে কোনোভাবেই সংযুক্ত এবং অবগত না। শহীদ আবু সাঈদের স্ট্রাকচার সম্পর্কেও আমরা অবগত ছিলাম না। কারও ব্যক্তিগত মতাদর্শে আঘাত দেওয়ার পক্ষেও না আমরা।এসব কুরুচিপূর্ণ ও প্রহসনমূলক সিদ্ধান্ত চারুকলার সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে নেওয়া হয়নি।”
তারা বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে, “এ আয়োজনে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের চাটুকারিতাপূর্ণ মনোভাবের কারণে শিক্ষকদের আয়োজন করা বৈশাখের আনুষ্ঠানিকতা ও শোভাযাত্রা সমর্থন করছি না।স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমরা মোটাদাগে প্রতি বছর চারুকলা অনুষদে আয়োজিত হয়ে আসা বৈশাখের আয়োজন এটা নয়। বরং স্বজনপ্রীতিদুষ্ট ও দেশের পরিবর্তনকালীন সময়ে রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী এবারের বৈশাখ ১৪৩২ এর আয়োজন ও আয়োজক কমিটিতে রয়েছে। এজন্য আমরা চারুকলার সাধারণ শিক্ষার্থীরা বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করি, আমাদের এই সিদ্ধান্তকে সবাই সমর্থন ও সম্মান জানাবে।”
অনেকেই মনে করছেন এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রা হাইজ্যাক করার অভিযোগ উঠছে মহম্মদ ইউনুস প্রশাসন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জামাতের মতো কট্টরপন্থীদের বিরুদ্ধে। তবে শেখ হাসিনা জামানা বদলের পর এবারের পয়লা বৈশাখে বাংলাদেশের নববর্ষের অনুষ্ঠান ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’য় কোনও ইঙ্গিতপূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যাবে কী না তা নিয়ে একটা জল্পনা তৈরি হয়েছিল কিছুদিন আগেও।পরিবর্তনের বাংলাদেশে এবার বাংলা নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম বদলাতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন অন্তঃবর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তবে বদলে যাওয়ার শঙ্কা থাকলেও এবছর বদল হয় নি বাংলাদেশের নববর্ষের অনুষ্ঠান ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে শোভাযাত্রার নাম বদল নিয়ে কথা হয়নি। তবে শোভাযাত্রা পেয়েছে নয়া স্লোগান। সেই স্লোগান হল ‘নববর্ষের ঐকতান, ফ্যাসিবাদের অবসান’।
আসলে নতুন বাংলা বর্ষবরণের এই শোভাযাত্রা মঙ্গল শোভাযাত্রা হিসেবেই পরিচিত।রাষ্ট্রসঙ্ঘের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা–ইউনেসকো ২০১৬ সালে এই শোভাযাত্রাকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়।এই শোভাযাত্রায় শিক্ষার্থীরা অমঙ্গলকে দূর করার জন্য বাঙালির নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক, প্রাণীর প্রতিকৃতি ও মুখোশ নিয়ে শোভাযাত্রা করে। এই শোভাযাত্রা অশুভকে দূর করা, সত্য ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীক।
এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্জনের ঘোষণায় পরিবর্তনের বাংলাদেশে নতুন করে প্রশ্ন উঠল।কারণ এই শোভাযাত্রা ধর্মীয় পরিচয়কে পিছনে ফেলে বাঙালি আত্মপরিচয়ের সমর্থন যোগায়। পাকিস্তানপন্থী হয়ে ওঠা নতুন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু মুজিবর রহমানের অবদান বারবার নানাভাবে নস্যাৎ করা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে সেখানে মঙ্গল শোভাযাত্রার ঐতিহ্যও টিকে থাকবে কী না সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
Leave a comment
Leave a comment
