দামি কলকাতায় ‘ব্রাত্য’ ছাপোষা বাঙালিয়ানা
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
১২ টাকায় পেট পুরে খাওয়া! কলকাতা ছাড়া ভূ- ভারতে নৈব নৈব চ। মাছে-ভাতে মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে এটাই স্বপ্নের তিলোত্তমা।
কিন্তু যত দিন যাচ্ছে তত দামি হচ্ছে মহানগরী কলকাতা। প্রতি বর্গফুটে জমি ও বাড়ির দাম হয়েছে আকাশছোঁয়া। একদিকে সরকারি উদ্যোগে নগরায়নের নানা প্রকল্প অন্যদিকে অত্যাধুনিক পরিকাঠামোর ছোঁয়া লেগেছে শহর কলকাতা ও শহরতলী জুড়ে। আর এই দুয়ের জাঁতাকলে পড়ে একদিকে যেমন দামি হচ্ছে কলকাতা, অন্যদিকে একটু একটু করে মহানগরী হারাচ্ছে তার ‘ছাপোষা বাঙালিআনাকে’। গত পাঁচটি জনগণনা সমীক্ষা খতিয়ে দেখা যাচ্ছে রাজ্যে টাউন বা মফস্বলের বাসিন্দাদের সংখ্যা ক্রমে বেড়ে চললেও মহানগরী কলকাতায় বাসিন্দাদের সংখ্যা কমছে। ১৯৭১ থেকে ২০১১, পাঁচ দশকের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যের শহরে জনসংখ্যা ৫০ বছরে ১ কোটি ৯ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৯১ লাখে পৌঁছেছে। ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী যা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩২ শতাংশ। এরমধ্যে (২০১১ জনগণনা অনুযায়ী) মহানগরী ও সংযোজিত কলকাতার বাসিন্দা হলেন প্রায় এক কোটি ৪১ লাখ। ১৯৭১ সালে যা ছিল ৭০ লাখের কিছু বেশি। আপাতদৃষ্টিতে জনসংখ্যার এই বৃদ্ধি ঊর্ধ্বমুখী হলেও রাজ্যের মোট শহুরে জনসংখ্যার শতাংশের বিচারে কলকাতা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দাদের বৃদ্ধির গ্রাফ কিন্তু নিম্নমুখী। ১৯৭১ সালের জনগণনায় যা ছিল ৬৪ শতাংশ তা নামতে নামতে ২০০১ সালে হয়েছে প্রায় ৫৯ শতাংশ। আরো দশ বছরে অর্থাৎ ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী তা নেমে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৪৮ শতাংশে। পাশাপাশি জনঘনত্বের ভাড়ারেও টান পড়েছে। ২০১১ জনগণনা অনুযায়ী কলকাতা শহরের জনঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৪ হাজার ২৫২। অথচ ২০০১ এর জনগণনা অনুযায়ী তা ছিল প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২৪ হাজার ৭১৮। লক্ষণীয় যে গত পাঁচটি জনগণনার মধ্যে শেষ ১০ বছরে অর্থাৎ ২০০১ থেকে ২০১১ এক ধাক্কায় কলকাতা ও শহরতলীর জনসংখ্যায় ১০ শতাংশ ঘাটতি হয়েছে।
শুধু রাজ্যের নিরিখেই নয়, জাতীয় স্তরে কলকাতার ছবিটাও বিপরীতধর্মী। দেশের চার মেট্রো শহর দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই ও কলকাতার তুল্যমূল্য চিত্র অনুযায়ী একমাত্র কলকাতাতেই ২০০১ থেকে ২০১১ এই দশ বছরে এক লাখেরও বেশি মানুষ মহানগর ছেড়ে আধা শহর বা মফস্বলমুখী হয়েছেন। অথচ দিল্লি, মুম্বই ও চেন্নাই মহানগরীতে এই সময়কালে বাসিন্দাদের সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে প্রায় ১১ লাখ, ৫ লাখ এবং প্রায় সাড়ে ৩ লাখ। জনগণনা সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০০১ সালে কলকাতার জনসংখ্যা ছিল ৪৫ লাখ ৭২ হাজার অথচ ২০১১ সালে তা নেমে দাঁড়ায় ৪৪ লাখ ৮৬ হাজারে। পাশাপাশি মুম্বইতে ২০০১ জনগণনা অনুযায়ী লোকসংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৯ লাখ। যা ১০ বছর পর বেড়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ২৪ লাখে। দিল্লিতে ২০০১ এ ছিল ৯৮ লাখ ৭৯ হাজার ২০১১ এ দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখ। চেন্নাইতে ২০০১ এর জনসংখ্যা ৪৩ লাখ ৪৩ হাজার যা ২০১১ এ ৪৬ লাখ ৮১ হাজারে পৌঁছয়। অর্থাৎ দেশের চার মেট্রো শহরের মধ্যে জনগণনা সমীক্ষা অনুযায়ী একমাত্র কলকাতাতেই ‘দেশান্তরী’র লক্ষণ স্পষ্ট।
২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর শহরতলিতে নগরায়ন প্রকল্পের কাজ আরও দ্রুত গতিতে এগিয়েছে। কলকাতার ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাসের সম্প্রসারণের ফলে কলকাতা কর্পোরেশন এলাকা ছাড়িয়ে নরেন্দ্রপুর,রাজপুর, সোনারপুর, বারুইপুর পর্যন্ত শহুরে প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। অন্যদিকে, বেহালা-সরশুনা থেকে জোকা পর্যন্ত কলকাতা মহানগরী লাগোয়া শহরতলী এলাকায় দ্রুত নগরায়নের দিকে এগিয়েছে। সর্বোপরি কলকাতা মহানগরীর পাশাপাশি নতুন নগর হিসেবে নিউটাউনের উত্থান এবং তার সঙ্গে রাজারহাট পুরসভা ও পঞ্চায়েত সমিতি এলাকায় দ্রুত নগরায়ন ব্যস্ততম কলকাতা মহানগরী থেকে মানুষকে নিরিবিলি আশ্রয়ের সন্ধান দিয়েছে। যার টানে ২০১১ পরবর্তী সময় গত এক দশক ধরে মূল কলকাতাবাসী মহানগর ছেড়ে আধা শহরমুখী হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই বনেদি কলকাতার প্রশ্ন
“কলকাতা কি দিন দিন তার আপনজনকেই হারিয়ে ফেলছে?” প্রশ্ন উঠেছে, কলকাতা এভাবে ‘আপন-হারা’ হচ্ছে কেন?
সমাজ গবেষকদের ধারণা, গ্লোবালাইজেশনের ফলে একালের কলকাতা ক্রমশ তার নিজস্বতা থেকেই সরে আসছে। দামি নগর জীবনে অভ্যস্ত মানুষজনের ভিড় বাড়ছে, অথচ আপাত নিরীহ বাঙালির জীবনের স্বাদ-সংস্কৃতি ক্রমশ ফিকে হচ্ছে। প্রতিযোগিতার জীবনে এতে উঠতে না পেরে সাধারণ মধ্যবিত্ত বা ছাপোষা বাঙালি তা থেকে পালিয়ে বাঁচছেন মফস্বলে বা আধা শহরের শান্ত জীবনে। সমীক্ষকদের মতে, ঠিক এ কারণেই কলকাতার কাছাকাছি বারাসাত, মধ্যমগ্রাম, রাজারহাট, নিউটাউন, নরেন্দ্রপুর, রাজপুর-সোনারপুর, ঠাকুরপুকুর,জোকা এমনকি হাওড়ার আন্দুল, সাঁতরাগাছি ইত্যাদি এলাকায় মধ্যবিত্তের ভিড় বাড়ছে তরতরিয়ে। ছিমছাম কলকাতার আবহাওয়া এবং সাধ্যের মধ্যে সাধপূরণ করতে পেরে ছাপোষা বাঙালির আকর্ষণ এখন বৃহত্তর কলকাতাই। পক্ষান্তরে, মহানগরী কলকাতায় জমি অথবা ফ্ল্যাটের দাম যেভাবে বাড়ছে তা মধ্যবিত্তের সাধ্যের বাইরে। সেই সুযোগে কলকাতায় থাবা বসাচ্ছে তুলনামূলক স্বচ্ছল অবাঙালিরা। সমাজতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, এটা উন্নয়নের বহমান ধারায় একটা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। ঠিক যেমন পুরনো দিল্লি বা মুম্বইয়ের বস্তি এলাকার ক্ষেত্রে হয়েছিল এক্ষেত্রেও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তবে কলকাতার এই বিপরীত প্রবণতা নিয়ে চিন্তিত নন রাজ্যের প্রাক্তন নগর উন্নয়ন সচিব তথা হিডকোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান দেবাশিস সেন। দেবাশীষ বাবুর মতে, কলকাতার উপর জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে রাজারহাট নিউটাউন অথবা আসানসোল দুর্গাপুরের মত নগরায়ন প্রকল্পকে যেভাবে রাজ্য সরকার বিস্তৃত করেছে তার প্রভাবেই ধীরে ধীরে মানুষ নতুন নতুন শহর পরিকল্পনার অঙ্গীভূত হচ্ছেন। অবশ্য কলকাতায় পরিবেশ দূষণের ক্রমবর্ধমান ঘটনাকে এক্ষেত্রে দায়ী করতে নারাজ রাজ্য প্রশাসন। রাজ্য পরিবেশ দপ্তরের কর্তাদের মতে, পরিবেশ দূষণ নয়, ব্যাপক নগরায়নই এর মূল কারণ। কলকাতায় জীবনযাত্রার মান এতটাই দামি হয়ে যাচ্ছে যে সাধারণ মধ্যবিত্ত কলকাতা থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের সরিয়ে নিচ্ছেন। এতে আখেরে কলকাতার উপর জনসংখ্যা চাপ যেমন কমছে তেমনি কিছুটা হলেও কলকাতা তার নিজস্বতাকে হারাচ্ছে সে কথা অবশ্য মানছেন পরিবেশবিদরা। রাজ্য জনসংখ্যা দপ্তরের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, “কলকাতা মহানগরীর এই বদলের ছবিটা তাদের চোখেও ধরা পড়েছে। এর ফলে শহরের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে তা নিয়ে বেশ কিছু বৈঠক বা আলোচনাও হয়েছে। কিন্তু মানুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করার মত কোন সরকারি মেকানিজম নেই যা দিয়ে কলকাতার নগর জীবনের এই বৈশিষ্ট্যকে আঁকড়ে ধরে রাখা যেতে পারে।”
সবমিলিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে কলকাতার নগর জীবন থেকে ধীরে ধীরে শুধু মধ্যবিত্ত দূরে সরছেন তাই নয়, দিন দিন পর্যায়ক্রমে কলকাতা হারাচ্ছে তার আপনজনকে। কলকাতা থেকে ব্রাত্য হচ্ছে ‘ছাপোষা বাঙালিয়ানা’।
