১ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালন করা হয় এপ্রিল ফুলস ডে। এই এপ্রিল ফুলের দিন সকাল থেকেই নানা প্ল্যান আর ফন্দি ফিকির চলে কাকে কিভাবে বোকা বানানো যায়। আসলে চালাক সেজে অন্যকে বোকা বানানোর মজাই আলাদা কি বলুন। আর তার ওপর যদি তার জন্য গোটা একটা দিন বরাদ্দ হয় তাহলে তো আর কথাই নেই। আর দেখে কে সারাদিন ধরে সময়ে, অসময়ে বোকা বানানোর নানা ফন্দি ফিকির খোঁজা। আর নিজে চালাক হয়ে ঘুরে ঘুরে বোকা সোকা লোক দেখে বোকা বানানো। আর সগর্বে বলা আজ এপ্রিল ফুল।
এই পয়লা এপ্রিল উদযাপনের নেপথ্যে সঠিক কী ঘটনা ছিল, তা নিয়ে বহু তথ্যই উঠে আসে। তবে অনুমান, ১৬ শতকে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার থেকে গ্রেগারি জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারে পরিবর্তনের সময়কাল থেকেই এই ১ এপ্রিল উদযাপন হয়ে থাকে। ক্যালেন্ডার মাফিক, ১৫৮২ সালে প্রথমবার পয়লা জানুয়ারি থেকে নতুন বছর শুরু হয়। তার আগে, জুলিয়ান ক্যালেন্ডার মতে, ১ এপ্রিলকে বছরের প্রথম দিন বলেই ধরা হত।
অর্থাৎ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সময়ে মার্চের শেষ লগ্নকে মনে করা হত বছরের শেষ সময়। আর বছরের শুরুর দিনটি হল এপ্রিলের প্রথম দিন। যদিও গ্রেগারি জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারে সেটি পাল্টে যায়। তবে গ্রেগারি জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনা হলেও, তা অনেকেই মেনে নিতে চাননি। অনেকেই ১ এপ্রিলকেই বছরের শুরুর দিন বলে মনে করতে থাকেন।
এরপর থেকে প্রচারিত হতে থাকে যে, যাঁরা জর্জিয়ান ক্যালেন্ডার না মেনে ১ এপ্রিলে নববর্ষ পালন করবে, তাঁদের ‘বোকা’ বলা হবে। তাঁদের নিয়ে হবে হাসির খোরাক। গোটা ঘটনাই ইউরোপকে কেন্দ্র করে হতে থাকে। কারণ ফ্রান্সই প্রথম জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের স্বীকৃতি দিতে থাকে। সেই থেকেই ১ এপ্রিল থেকেই ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ পালিত হয়।
আবার অনেকে বলে থাকেন, ল্যাটিন শব্দ ‘হিলরা’ থেকে এই এপ্রিল ফুলের ভাবনা এসেছে। এই শব্দের অর্থ হল হাসি ঠাট্টা। আর তা থেকেই এই এপ্রিল ফুল-এর দিন হাসি আনন্দে মেতে থাকার ভাবনা এসেছে। জিওফ্রে চসারের ‘দ্য ক্যান্টেরবারি টেলস’-এ ৩২ মার্চ বা ১ এপ্রিলের উল্লেখ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১ এপ্রিলকে কেন্দ্র করে বিশেষভাবে কোনও একটি ছুটি না থাকলেও, এই দিনে সকলের সঙ্গে মিলে মিশে হাস্যরসে মেতে ওঠার দিন হিসাবে পালিত হয়। ফলে সাবধানে থাকুন, আপনাকে যেন কেউ এপ্রিল ফুল-এর দিন বোকা না বানিয়ে দিতে পারেন!
এই এপ্রিল ফুল দিবসের দিনে ২০০১ সালে ডেনামার্কের কোপেনহেগেনে এপ্রিল ফুল দিবস উপলক্ষে রাস্তায় সৃষ্টি করা একটি স্থাপত্য যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে। অন্য নাম দেওয়া হয় সকলকে বোকা বানানোর দিন। এই দিন প্রতিবেশীদের উপর কৌতুক করার জন্য একটি দিন হিসাবে সর্বত্র স্বীকৃত।
এপ্রিল ফুলস ডে এর কিছু প্রিকার্সর হলো, এটি রোমান হিলারিয়া উৎসব, ভারতের হোলি উৎসব,এবং এর মধ্যযুগীয় ফুল ফিস্ট জড়িত। ইরানে পার্সি ক্যালেন্ডার অনুসারে নববর্ষের ১৩তম দিনে আনন্দ ও মজা করা হয়। এই দিন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ১লা এপ্রিল ও ২রা এপ্রিল সদৃশ্য।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সে নতুন ক্যালেন্ডার চালু করাকে কেন্দ্র করে এপ্রিল ফুল ডে’র সুচনা হয়। ঐ ক্যালেন্ডারে ১লা এপ্রিলের পরিবর্তে ১লা জানুয়ারীকে নতুন বছরের প্রথম দিন হিসেবে গণনার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে কিছু লোক তার বিরোধিতা করে।
যারা পুরনো ক্যালেণ্ডার অনুযায়ী ১লা এপ্রিলকেই নববর্ষের ১ম দিন ধরে দিন গণনা করে আসছিল, তাদেরকে প্রতি বছর ১লা এপ্রিলে বোকা উপাধি দেয়া হতো।
ফ্রান্সে পয়সন দ্য আভ্রিল(poisson d’avril) পালিত হয় এবং এর সাথে সম্পর্ক আছে মাছের। এপ্রিলের শুরুর দিকে ডিম ফুটে মাছের বাচ্চা বের হয়। এই শিশু মাছগুলোকে সহজে বোকা বানিয়ে ধরা যায়। সেজন্য তারা ১ এপ্রিল পালন করে পয়সন দ্য এভ্রিল অর্থাৎ এপ্রিলের মাছ।
সে দিন বাচ্চারা অন্য বাচ্চাদের পিঠে কাগজের মাছ ঝুলিয়ে দেয় তাদের অজান্তে। যখন অন্যরা দেখে তখন বলে ওঠে পয়সন দ্য আভ্রিল বলে চিৎকার করে। কবি চসারের ক্যান্টারবারি টেইলস(১৩৯২) বইয়ের নানস প্রিস্টস টেইল এ এই দিনের কথা খুজে পাওয়া যায়।
যুক্তরাজ্যে এপ্রিল ফুলের দিন প্রাপককে অর্থাৎ যিনি এপ্রিলের বোকা হন তাকে “এপ্রিল ফুল!” বলে হাসি তামাশা ও চিৎকার করে প্রকাশ করা হয়। অল ফুলস ডে নামেও পরিচিত । এপ্রিল ফুল দিবস , বেশিরভাগ দেশে এপ্রিলের প্রথম দিন। এই দিনে ব্যবহারিক কৌতুক খেলার প্রথা থেকে এটির নাম এসেছে।
উদাহরণস্বরূপ, বন্ধুদের বলা যে তাদের জুতার ফিতা খুলে দেওয়া হয়েছে বা তথাকথিত বোকাদের কাজে তাদের পাঠানো। যদিও দিনটি কয়েক শতাব্দী ধরে পালন করা হয়েছে, তবে এর প্রকৃত উত্স অজানা এবং কার্যকরভাবে অজানা। এটি 25 মার্চ অনুষ্ঠিত প্রাচীন রোমের হিলারিয়া এবং ভারতে হোলি উদযাপনের মতো উত্সবগুলির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা 31 মার্চ শেষ হয়।
কেউ কেউ প্রস্তাব করেছেন যে আধুনিক প্রথার উৎপত্তি ফ্রান্স , আনুষ্ঠানিকভাবে রুসিলনের আদেশের সাথে (আগস্ট 1564 সালে জারি করা হয়েছিল), যেখানে চার্লস IX আদেশ দিয়েছিলেন যে নতুন বছরটি আর ইস্টারে শুরু হবে না , যেমনটি খ্রিস্টজগতে প্রচলিত ছিল, বরং 1 জানুয়ারি।
কারণ ইস্টার ছিল চন্দ্র এবং অতএব চলমান তারিখ, যারা পুরানো উপায়ে আঁকড়ে ধরেছিল তারা ছিল “এপ্রিল ফুল”। অন্যরা পরামর্শ দিয়েছেন যে দিনের সময়টি ভার্নাল ইকুনোক্স (21 মার্চ) এর সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, এমন একটি সময় যখন আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তনের কারণে মানুষ বোকা হয়।
এপ্রিল ফুল দিবস উদযাপনের ক্ষেত্রে দেশগুলির মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে, তবে সবাইকে বোকা বানানোর জন্য একটি অজুহাত রয়েছে। ফ্রান্সে, উদাহরণস্বরূপ, বোকা ব্যক্তিকে বলা হয় পয়সন ডি’এভ্রিল (“এপ্রিল মাছ”), সম্ভবত একটি অল্প বয়স্ক মাছের জন্য এবং তাই সহজেই ধরা যায় এমন একটি মাছের জন্য; ফরাসি বাচ্চাদের পক্ষে সন্দেহজনক বন্ধুদের পিঠে কাগজের মাছ পিন করা হয়।
অন্য দিকে স্কটল্যান্ডের দিনটি হল গোউকি ডে, গৌক বা কোকিলের জন্য , মূর্খ এবং কোকিলের প্রতীক, যা পরামর্শ দেয় যে এটি যৌন লাইসেন্সের সাথে এক সময় যুক্ত ছিল; পরের দিন বন্ধুদের পিঠে “কিক মি” লেখা চিহ্নগুলি পিন করা হয়৷ এই ভাবে নানা দেশে নানা ভাবে পালন করা হয় এপ্রিল ফুল।
তবে যস্মিন দেশে যদাচার যাই হোক আসল কথা হলো পয়লা এপ্রিল বোকা বানানো অন্যকে। যাতে সে বুঝতে না পারে সে তার বন্ধু, কাছের মানুষ গুলো নিছক মজা পাওয়ার জন্যে মজা করার জন্য আকুল হয়ে অন্যকে বোকা প্রমাণিত করে নিজেরা মজা পায়।
তারা নিজেরা মনে করে চালাক চতুর হয়ে তারা বেশ বোকাদের, ঠিক এই ভাবে সারা বছর যেমন করে বোকা বানায়। ঠিক তেমনি করেই এই এপ্রিল ফুল পালনের দিনেও এক ভাবে বোকা বানিয়ে আরো একটু বেশি মজা পায় তারা। এটাই হলো আসল কথা। বোকা আর চালাক জগতে না থাকলে কি আর জমত এই এপ্রিল ফুলের এই মজার দিনটা বলুন। আজ এপ্রিল ফুল।
এপ্রিল ফুল – অভিজিৎ বসু।
পয়লা এপ্রিল, দু হাজার পঁচিশ।

