সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকার সংসদে ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল পেশ করেছে, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য নির্ধারিত ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে চলেছে। এই বিলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহল এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। একদিকে মুসলিম মহিলাদের একাংশ এই বিলকে স্বাগত জানিয়েছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে মুসলিম সম্পত্তির ওপর সরকারি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।
ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত একটি তহবিল, যার তত্ত্বাবধান ওয়াকফ বোর্ডের হাতে থাকে। নতুন সংশোধনীতে সরকার ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা বাড়াতে চায়। পাশাপাশি, ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তির সুযোগ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলাগুলোর নিষ্পত্তিতে সরকারি হস্তক্ষেপ বৃদ্ধির প্রস্তাব আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলিকে কেন্দ্র করেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
দিল্লি এবং ভোপালে একদল মুসলিম মহিলা এই বিলের সমর্থনে রাস্তায় নেমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ধন্যবাদ জানান। তাঁদের মতে, এই বিল মুসলিম নারীদের জন্য সুবিচার নিশ্চিত করবে এবং ওয়াকফ বোর্ডের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বাড়াবে। দীর্ঘদিন ধরে ওয়াকফ সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ছিল। তাঁদের বিশ্বাস, নতুন বিল কার্যকর হলে এসব দুর্নীতি অনেকাংশে কমবে।
অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মুসলিম সংগঠনগুলো এই বিলকে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থবিরোধী বলে দাবি করছে। তাঁদের মতে, সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের ফলে ওয়াকফ বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন নষ্ট হবে এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সামাজিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের দাবি, অমুসলিমদের ওয়াকফ বোর্ডে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি মুসলিম সম্পত্তির মালিকানার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি, এই বিল পাস হলে সরকারের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা চলে যাবে, যা ভবিষ্যতে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে।
আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজু স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিলের উদ্দেশ্য ওয়াকফ বোর্ডের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা। তাঁর মতে, এটি কোনও সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, বরং দুর্নীতি রোধ ও প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই প্রস্তাবিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘ওয়াকফ সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ও সংস্থার স্বচ্ছতা বৃদ্ধির জন্যই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।’’
এই বিল নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই কিছু মুসলিম সংগঠন সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার পরিকল্পনা করছে। তাঁদের মতে, এই বিল ধর্মীয় সম্পত্তির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। বিরোধী দলগুলি সংসদেও এই বিলের কড়া বিরোধিতা করেছে এবং সরকারের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে।
বিলটি সংসদে পাস হওয়ার পর বাস্তবিক প্রয়োগ কীভাবে হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সরকারের দাবি, এটি সংস্কারের একটি পদক্ষেপ, তবে বিরোধীরা এটিকে মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার সংকুচিত করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনগুলির প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে, এই বিল মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য কতটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক হবে।
