দেশের বিচারব্যবস্থায় যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে, তখন বিতর্কের কেন্দ্রে থেকে আলোচনায় উঠে এলেন যশবন্ত বর্মা। দিল্লি হাইকোর্টের প্রাক্তন এই বিচারপতি সম্প্রতি আল্লাহাবাদ হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। যদিও বিচারপতির এই বদলি একটি প্রশাসনিক ও রুটিন বিষয়, তবে শপথ গ্রহণকে ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে এক গভীর বিতর্কের আবহ।
২৮ মার্চ ২০২৫ তারিখে রাষ্ট্রপতির অনুমোদিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিচারপতি বর্মার স্থানান্তর কার্যকর হয়। সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম এই বদলির পক্ষে সুপারিশ করেছিল এবং তাতেই সরকারও সায় দেয়। তবে এই পুরো প্রক্রিয়াটি ঘটে একটি বিতর্কিত ঘটনার পটভূমিতে। জানা গেছে, দিল্লিতে বিচারপতি যশবন্ত বর্মার সরকারি আবাসনে সম্প্রতি আগুন লাগে। পরবর্তীতে সেই আবাসন থেকে আধা-পোড়া বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ উদ্ধার করে তদন্তকারী সংস্থাগুলি। টাকা কোথা থেকে এলো, কীভাবে এত পরিমাণ নগদ রাখা হয়েছিল—তা নিয়ে শুরু হয়েছে তদন্ত। সূত্র বলছে, টাকা উদ্ধার হওয়ার ঘটনাটি কোনও সাধারণ পরিস্থিতি নয় এবং সেই কারণেই বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা নজর রেখেছে।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিচারপতির শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি হয় অত্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে। কোনও সংবাদমাধ্যম বা আইনজীবী মহলের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। অনেকেই বলছেন, এই বিতর্কের প্রভাবেই প্রশাসন অনুষ্ঠানটি সীমিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। তবে তাতেও বিতর্ক থামেনি। বরং আল্লাহাবাদ হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন একধাপ এগিয়ে প্রকাশ্যে এর বিরোধিতা জানিয়েছে। তারা প্রধান বিচারপতির কাছে একটি লিখিত প্রতিবাদপত্র জমা দিয়েছে এবং স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন তুলেছে—একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে যখন তদন্ত চলছে, তখন কীভাবে তাঁকে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাইকোর্টে দায়িত্ব দেওয়া যায়? এই ধরনের নিয়োগে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
আদালতের অভ্যন্তরেও প্রশাসনিক স্তরে বিষয়টি নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। বিচারপতি বর্মাকে এখনও পর্যন্ত কোনও বড়সড় বা আলোচিত মামলার দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর বিচারিক ভূমিকা কতটা সক্রিয় হবে, সে নিয়েও একধরনের ধোঁয়াশা দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত তদন্ত শেষ হচ্ছে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হচ্ছে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাঁকে বিচারিক কাজে নিয়োজিত করা উচিত নয়।
এই ঘটনা ফের একবার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—বিচারপতি নিয়োগ কতটা স্বচ্ছ এবং নৈতিকতার ভিত্তিতে হয়ে থাকে? সুপ্রিম কোর্ট কলেজিয়াম যে নাম সুপারিশ করে, তা নিয়ে সংসদ বা জনগণের কোনও প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। ফলে এমন কোনও নিয়োগে যদি বিতর্কের ছায়া থাকে, তা হলে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারবিভাগের সর্বোচ্চ স্তরেও যদি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিতর্ক থেকে যায়, তা হলে বিচারব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এমন একটি পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র যশবন্ত বর্মার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নয়, বরং গোটা বিচারবিভাগের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত এমন দায়িত্ব প্রদান থেকে বিরত থাকাই ছিল যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত।
শেষমেশ বিচারপতি যশবন্ত বর্মার বিরুদ্ধে তদন্তে কী উঠে আসে, সেটাই নির্ধারণ করবে তাঁর পেশাগত বিশ্বাসযোগ্যতা। তবে পাশাপাশি এই ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার আলোচনায় উঠে এসেছে বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার জরুরি প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের চোখে বিচারব্যবস্থাকে বিশ্বাসযোগ্য রাখতে হলে এই ধরণের বিতর্ক থেকে মুক্ত থাকা আজকের দিনে অপরিহার্য।
