মুম্বইয়ের অল্টামাউন্ট রোডে অবস্থিত ‘অ্যান্টিলিয়া’ শুধু ভারতের নয়, বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল ও চমকপ্রদ বাসভবন হিসেবে পরিচিত। এটি রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মুকেশ অম্বানীর পরিবারিক আবাসস্থল। বিশাল এই অট্টালিকা তার স্থাপত্য ও বিলাসিতার জন্য যেমন আলোচিত, তেমনি এর জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিতর্কের জন্যও চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে।
এই জমিটি নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল বহু বছর আগে, যখন জানা যায় যে অ্যান্টিলিয়ার ওপর নির্মিত জমিটি আসলে একটি ওয়াকফ সম্পত্তি। ওয়াকফ বোর্ডের নথি অনুযায়ী, এই জমিতে একসময় ‘করিমভাই ইব্রাহিম খোজা ইয়াতিমখানা’ নামে একটি এতিমখানা ছিল। ১৮৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত দরিদ্র ও অনাথ শিশুদের আশ্রয় এবং শিক্ষা দেওয়ার জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল। এর জমি ও স্থাপনাগুলি একটি ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত হতো, যারা ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যেই এই সম্পত্তি ব্যবহার করত।
২০০২ সালে, এতিমখানার ট্রাস্ট একটি প্রাইভেট কোম্পানির কাছে প্রায় ২১ কোটি টাকায় সম্পত্তিটি বিক্রি করে দেয়। সংস্থাটির নাম ছিল ‘অ্যান্টিলিয়া কমার্শিয়াল প্রাইভেট লিমিটেড’। এরপরই বিতর্ক শুরু হয়, কারণ বিক্রয় প্রক্রিয়াটি ওয়াকফ অ্যাক্টের নিয়ম অনুসারে যথাযথ ছিল না বলেই অভিযোগ ওঠে। আইনের ধারা ৫১ অনুযায়ী, কোনও ওয়াকফ সম্পত্তি বিক্রি করতে হলে সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ বোর্ডের অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই ক্ষেত্রে এমন কোনও অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে বোর্ড দাবি করে।
এই বিক্রয় প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে মহারাষ্ট্র ওয়াকফ বোর্ড ২০০৫ সালে আদালতের দ্বারস্থ হয়। তাদের বক্তব্য ছিল, যেহেতু জমিটি এতিমখানার অধীন এবং অনাথ শিশুদের জন্য বরাদ্দ ছিল, তাই এটি ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হস্তান্তর বেআইনি। বোর্ডের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, এই সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা জনগণের কল্যাণের সঙ্গে জড়িত, তাই এটি কোনও ব্যক্তিবিশেষের বিলাসবহুল বাসভবন হতে পারে না।
বিচারিক প্রক্রিয়া এখনও চলছে এবং আদালতের রায় আসা বাকি। এই অবস্থায় অম্বানী পরিবারের বসবাস নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তারা এখনও অ্যান্টিলিয়াতেই বসবাস করছেন। তবে আইনি প্রক্রিয়ার শেষ ফলাফলের উপরই নির্ভর করছে যে তারা ভবিষ্যতেও সেখানে থাকতে পারবেন কিনা।
এই বিতর্কের প্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২৪ সালে প্রস্তাবিত ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বিল আইনে রদবদলের মাধ্যমে ওয়াকফ বোর্ডগুলির ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংগঠিত করতে পারে। অনেকের মতে, এই পরিবর্তন অ্যান্টিলিয়ার মতো বিতর্কিত সম্পত্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে দেশজুড়ে এই মামলাটি নিয়ে জনমত বিভক্ত। একাংশ মনে করে, যেহেতু জমির ইতিহাস ধর্মীয় ও সমাজসেবামূলক উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত, তাই এটিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আবার অনেকে মনে করেন, বিক্রয় আইনি পদ্ধতিতেই হয়েছে এবং এত বছর পর এসে বিষয়টি নতুন করে টেনে আনা অর্থহীন।
সত্যি কী, তা নির্ধারণের ভার এখন বিচারব্যবস্থার উপর। অ্যান্টিলিয়া শুধুই এক বিলাসবহুল বাড়ি নয়, এটি আজ ভারতের আইনি ও নৈতিক বিতর্কের এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বিতর্কের নিষ্পত্তি কেবল একটি বাড়ির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং ধর্মীয় সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং দায়িত্ববোধ কতটা আছে, তা-ও প্রকাশ করবে।
