গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের রূপ নিয়েছে। গত কয়েক মাসের টানা বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ, যাদের বেশিরভাগই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে ‘নিধনযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছে।
এই সংঘাতের সূচনা ঘটে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠন হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে একটি আকস্মিক হামলা চালায়। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নাগরিক প্রাণ হারান এবং প্রায় ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এই ঘটনার জবাবে ইসরায়েল পূর্ণমাত্রায় সামরিক প্রতিক্রিয়া শুরু করে গাজা উপত্যকায়।
ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া শুধুমাত্র হামাসের ওপর আঘাত হানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং, গাজার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালানো হয়, যার ফলে লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০,০০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকই নারী ও শিশু। হাজার হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়ে পড়েছেন।
গাজার অবকাঠামো প্রায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। হাসপাতাল, স্কুল, বাসস্থান এবং জরুরি সেবার কেন্দ্রগুলো পর্যন্ত হামলার লক্ষ্য হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন স্যাটেলাইট চিত্র ও ময়দানের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী একটি নির্দিষ্ট ‘নিধন এলাকা’ গঠন করেছে গাজার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে। এই অঞ্চলে সবকিছু গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে—বাড়ি, দোকান, শিল্পকারখানা এমনকি কৃষিজমিও বাদ যায়নি।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর অনেক সৈন্য স্বীকার করেছেন, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল “স্থায়ী পরিবর্তন” আনা, যাতে গাজা আর কখনো হামাস বা অন্য কোনো প্রতিরোধ আন্দোলনের ঘাঁটি না হয়ে ওঠে। তারা প্রকাশ্যে বলেছে, ‘ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য আজকের ধ্বংস জরুরি’। কিন্তু এই ধ্বংসের মূল্য গাজার নিরীহ জনগণকেই চুকাতে হয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, যেমন UNICEF ও WHO, এই পরিস্থিতিকে অভূতপূর্ব মানবিক সংকট হিসেবে ঘোষণা করেছে। গাজায় বর্তমানে বিশুদ্ধ জল, খাদ্য, ওষুধ এবং আশ্রয়ের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই নিয়েছে, যেখানে মৌলিক মানবাধিকারও মানা হচ্ছে না।
এই নিধনযজ্ঞ আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। কিছু দেশ ইসরায়েলের সমর্থনে থাকলেও, অধিকাংশ দেশ এই অমানবিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আদালতে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগও উঠেছে। এমনকি ইসরায়েলি সরকারের অভ্যন্তরেও এই অভিযান নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংঘাত শুধু গাজার মানবিক বিপর্যয়ই নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে ফেলেছে। কূটনৈতিক সমাধানের অভাবে দিন দিন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। সাধারণ জনগণই হচ্ছে মূল শিকার।
মানবতা আজ চরম পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধের এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ ও ত্বরিত সমাধান ছাড়া, এই সংঘাত কেবল ধ্বংস, মৃত্যু ও অশ্রুর উপাখ্যানে পরিণত হবে। শান্তির পথ খুঁজে পাওয়াই এখন একমাত্র বিকল্প, যেখানে রাজনীতি নয়, মানুষ এবং মানবিকতা থাকবে অগ্রাধিকার।
