ব্যাঙ্ককের বিমস্টেক সম্মেলনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে চলা আলোচনার ভেতর দিয়ে তৈরি হয় এক ভিন্নমাত্রার কূটনৈতিক আবহ। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর বলেন, “বাংলাদেশের অগ্রগতি আমাদের হৃদয়ের স্পন্দনে মিশে আছে। তাদের মঙ্গল মানেই আমাদের সুখ।” তার বক্তব্যে উঠে আসে এক গভীর আত্মিক সংযোগের বার্তা, যা কেবল রাষ্ট্রীয় স্তরে নয়, দুই দেশের মানুষের সম্পর্কের প্রতিফলন।
জয়শঙ্করের ভাষণে বোঝা যায়, দুই দেশের বন্ধন কোনো চুক্তির ফর্মালিটি নয়—এ এক নিবিড় ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন, যা সময়ের পরীক্ষায় বারবার প্রমাণিত হয়েছে। এই কথাগুলো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের অগ্রগতি আমাদের কাছে কেবল বন্ধুত্বের ব্যাপার নয়, বরং এক অন্তরঙ্গ দায়বদ্ধতা। জয়শঙ্করের বক্তব্যে ধরা পড়ে এমন এক সম্পর্কের ছায়া, যা প্রশাসনিক সীমার বাইরে গিয়ে মন ও মর্মের সংযোগে বাঁধা — যেখানে আত্মিক বন্ধন রাজনৈতিক কৌশলকে ছাপিয়ে যায়।
অন্যপ্রান্তে আলোচনার টেবিলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যে ভেসে ওঠে ভারতের সুস্পষ্ট অবস্থান। তিনি জানান, ভারত চায় বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ধারায় অটল থাকুক, কিন্তু সাম্প্রতিককালে সীমান্তে বেআইনি অনুপ্রবেশ এবং সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান হামলার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
এসব ঘটনাকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই বলেই মত দেন তিনি। মোদি জোর দিয়ে বলেন, এই ধরনের নির্যাতনের পেছনের সত্য উন্মোচন জরুরি এবং তার জন্য একটি নিরপেক্ষ ও বিস্তৃত তদন্ত প্রয়োজন। আলোচনায় উঠে আসে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বজায় রাখতে হলে এমন সমস্যার দ্রুত সমাধান আবশ্যক। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ সুদৃঢ় করতে মোদির এ বার্তা তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন ইউনুস ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন প্রসঙ্গ উত্থাপন করতেই বৈঠকের আবহ যেন হঠাৎ পাল্টে যায়। আলোচনার মাঝে এই প্রশ্ন এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে, যা আলোচনার গতি ও দিক উভয়ই বদলে দেয়।
রাজনীতির জল ঘোলা হওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট, কারণ এই ইস্যু ঘিরে দুই দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। ইউনুসের এই কৌশলী প্রশ্নে কিছুটা চাপে পড়তে হয় দিল্লিকে। আড়ালে থাকা নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যেন সামনের সারিতে এসে পড়ে, যার ফলে এই কূটনৈতিক পর্বটি হয়ে ওঠে আরও বেশি জটিল ও তাৎপর্যপূর্ণ।
তবুও জয়শঙ্করের বক্তব্যে মিলল এক আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত—সংকটের আবহেও ভারত চায় বাংলাদেশ ফেরুক গণতন্ত্রের স্বচ্ছ পথে। নির্বাচনের প্রক্রিয়া হোক নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক, এটাই ভারতের প্রত্যাশা। দুই দেশের সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের মন ছুঁয়ে যাওয়া আত্মিক বন্ধন।
এই টালমাটাল সময়ে জয়শঙ্করের কণ্ঠ যেন এক পরিশুদ্ধ বার্তা—বিপদের মুখেও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে শান্তির পতাকা ওড়ানোই ভারতের উদ্দেশ্য। দুই জাতির ভ্রাতৃত্ব, মিলেমিশে চলার ইচ্ছাই যেন তাঁর প্রতিটি শব্দে প্রতিফলিত।
