পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বর্ণময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। প্রয়াত হলেন প্রাক্তন মন্ত্রী রেজ্জাক মোল্লা। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন, সংগ্রামী মনোভাব ও কৃষক-কেন্দ্রিক ভাবনায় গড়া এই নেতার মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ রাজ্যের রাজনৈতিক মহল।
রেজ্জাক মোল্লার মৃত্যু ঘটে ১১ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার, বার্ধক্যজনিত কারণে। উত্তর ২৪ পরগনার বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল প্রায় ৮০ বছর। তাঁর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীরা, যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন বা রাজনৈতিক লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন।
রেজ্জাক মোল্লার জন্ম ১৯৪৪ সালের ৩১ জুলাই। ছোটবেলায় গ্রামবাংলার কৃষিজীবী সমাজের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। পিতা শেখ সাহেবুল হকের কাছ থেকেই কৃষি ও সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে ভাবার বীজ বপন হয় তাঁর মনে। ছাত্রজীবনে বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। প্রথমে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাঠে-ময়দানে সংগঠন গড়েন। পরবর্তীতে সিপিআই(এম)-এর হয়ে বিধানসভায় পা রাখেন।
১৯৭৭ সালে তিনি প্রথম নির্বাচিত হন ক্যানিং পূর্ব কেন্দ্র থেকে। তারপর একটানা আট বার জেতেন। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন। এই সময় রাজ্যে জমি সংস্কারের কাজ, ভূমিহীনদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সরকারি জমি নীতিতে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে।
তবে ২০১১ সালের পর রাজ্যের রাজনৈতিক চিত্র বদলে যায়। সিপিআই(এম)-এর ভরাডুবির পর দলীয় স্তরে প্রশ্ন উঠে রেজ্জাক মোল্লার অবস্থান নিয়েও। একাধিকবার প্রকাশ্যে দলীয় সিদ্ধান্তের সমালোচনা করায় ২০১৪ সালে সিপিআই(এম) তাঁকে বহিষ্কার করে। তাতে থেমে থাকেননি রেজ্জাক মোল্লা। গঠন করেন ‘ভারতীয় ন্যায়বিচার পার্টি’। যদিও পরে, ২০১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন এবং ভাঙড় কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন।
রাজনীতির ময়দানে তুখোড় বক্তা এবং সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। জোরালো বক্তব্য, দৃঢ় মনোভাব এবং বাস্তব অভিজ্ঞতায় গড়া তাঁর রাজনীতি বরাবরই ছিল মাটি-ঘেঁষা। কৃষকদের স্বার্থে লড়াই করা একজন সাচ্চা নেতাকে হারাল রাজ্য।
তাঁর মৃত্যুর খবরে শোকপ্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনৈতিক সফর, সংগ্রাম ও সাহস আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
রেজ্জাক মোল্লার প্রয়াণে শেষ হল এক দীর্ঘ ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক কাহিনির। কিন্তু তাঁর কাজ, আদর্শ ও ভূমিপুত্র ভাবনা বাংলার মাটিতে ছড়িয়ে থাকবে আরও বহুদিন।
