মুর্শিদাবাদের সামসেরগঞ্জ, সুতি ও ধূলিয়ান অঞ্চল যেন রণক্ষেত্র। বিগত কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত এই এলাকাগুলি। ভয়, আতঙ্ক আর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে, দোকানপাট লুট হয়েছে, শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের শব্দ। এই অবস্থায় নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে শতাধিক পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন মালদহের বৈষ্ণবনগরের দিকে। তারা গঙ্গা নদী পেরিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন পারলরপুর হাইস্কুলে।
অস্থায়ী এই ত্রাণ শিবিরে কেউ বিছানা পায়নি, কারও খাবার নেই, আবার কেউ প্রিয়জনদের খুঁজে পাচ্ছেন না। চোখে জল নিয়ে এক মহিলা বলেন, “সব শেষ হয়ে গেছে, ঘর নেই, খাওয়ার মতো কিছু নেই, জীবনটাই এখন অনিশ্চিত।” শিশুদের মুখে আতঙ্ক, বৃদ্ধদের মুখে অসহায়তার চিহ্ন।
ঘটনার সূত্রপাত একটি সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদকে ঘিরে হলেও পরিস্থিতি দ্রুতই রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক রূপ নেয়। এলাকার বহু ঘরবাড়ি ও দোকানপাটে আগুন লাগানো হয়েছে। ভিডিও ফুটেজে ধরা পড়েছে, একাধিক ব্যক্তি লাঠিসোটা, ধারালো অস্ত্র ও দেশীয় বোমা নিয়ে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বহু বাড়ি আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। প্রশাসনের উপস্থিতি থাকলেও তা যথেষ্ট বলে মনে করছেন না সাধারণ মানুষ। “পুলিশ আসে, কিছুক্ষণ থাকে, আবার চলে যায়। আমরা কাউকে চিনতে পারছি না, কোন গ্রুপ কী করছে, বুঝে উঠতে পারছি না,” বলেন এক স্থানীয় যুবক।
কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বিএসএফ ও রাজ্য পুলিশের যৌথ টহল চলছে এলাকায়। তবে তা এখনো আশ্বস্ত করতে পারেনি আতঙ্কগ্রস্ত পরিবারগুলোকে। বৈষ্ণবনগরের স্কুলে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলির অধিকাংশই বলছেন, তারা আপাতত নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে এসেছেন, বাড়ি ফিরতে চাইছেন না যতক্ষণ না সরকার নিশ্চয়তা দেয় সুরক্ষার।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে একটি ভিডিও যেখানে দেখা যাচ্ছে, বহু মানুষ ছোট ছোট নৌকায় গঙ্গা পার হচ্ছেন। কেউ মাথায় ব্যাগ, কেউ কোলে শিশু নিয়ে নদী পার হচ্ছেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এই ভিডিও পোস্ট করে অভিযোগ করেছেন যে রাজ্য সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে শান্তি রক্ষা করতে।
এই পরিস্থিতিতে বড় প্রশ্ন উঠছে, রাজ্য সরকার ও প্রশাসন কেন আগাম ব্যবস্থা নিতে পারল না? কেন নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ভুগতে হচ্ছে এত মানুষকে? এবং তারা কতদিন এভাবে গৃহহীন হয়ে কাটাবেন, সে প্রশ্ন এখন সময়ের কাছে।
এই সহিংসতা শুধু কয়েকটি পরিবারের নয়, গোটা সমাজের উপরেই একটা গভীর প্রশ্নচিহ্ন রেখে যাচ্ছে।
