সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
চোখ বন্ধ করে একবার কলকাতা শহরের কথা ভাবুন। আপনার বন্ধু চোখের সামনে ভেসে উঠবে বেশ কয়েকটি ছবি। যেমন হাওড়া ব্রিজ, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, অক্টারলোনি মনুমেন্ট, রাইটার্স বিল্ডিং, জিপিও বা আরো কিছু ব্রিটিশ স্থাপত্য। কিন্তু দেশীয় বা ভারতীয় স্থাপত্যের আইকন? অবশ্যই আপনার বন্ধু চোখের সামনে ফুটে উঠবে এটি দেশীয় ঘোড়া না আটচালা মন্দিরের ছবি। ৫১ সতী পিঠের অন্যতম পিঠ ও কালিকা ক্ষেত্র কালীঘাট মন্দির। দিল্লির যেমন লালকেল্লা বা কুতুব মিনার তেমনি কলকাতার অন্যতম আইকন দেশীয় স্থাপত্যের এই আটচালা মন্দির। আঠারো শতক থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বা হালফিলের বিশ্ব বরেণ্যদের ছবি-পোস্টকার্ডে ইতিহাস সমৃদ্ধ কলকাতার আইকন হিসেবে পরিচিত করিয়েছে দেশীয় স্থাপত্যের এই আটচালার কালিকা ক্ষেত্র। প্রতিবছর এই পয়লা বৈশাখে সেজেগুজে ওঠে এই সতীপীঠ। এবার এই সাজসজ্জায় নবতম সংযোজন স্কাইওয়াক।
কলকাতা ও সন্নিহিত অঞ্চলের প্রাচীনত্ব নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে ইতিহাসবিদদের বারবার কালীঘাট ও কালী ক্ষেত্রে ইতিহাস, ভূগোল ও লোকগাথা নিয়ে গবেষণা করতে হয়েছে। দক্ষিণেশ্বর থেকে বেহালা পর্যন্ত বিস্তৃত গঙ্গা তীরবর্তী ধনুক আকৃতির প্রায় ১৬ মাইল এলাকা কালীক্ষেত্র নামে পরিচিত। মাঝখানে কালীঘাটের এই কালিকা মন্দির কে রেখে ত্রিকোন অর্থাৎ তিনকোণায় ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর এর অধিষ্ঠান। কালের নিয়মে এই ত্রিগুণাত্মক হিসেবে পরিচিত ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর মন্দির অবলুপ্ত হলেও এখনও নকুলেশ্বর নামে রয়ে গেছেন মহাদেব। ঐতিহাসিকরা বলেন কালীঘাটের কালিকার তিনজন ভৈরব রয়েছেন যার মধ্যে অন্যতম এই নকুলেশ্বর। আর তিন ভৈরবের সেই কালিকায় প্রতিষ্ঠিত কালীঘাটের কালীমন্দিরে। দক্ষিণ বঙ্গের বণিকরা যখন জলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যে যেতেন বা গঙ্গাসাগরের কন্যার জনে যে পুণ্যার্থীরা যান তারা সকলেই এই কালীমন্দিরে প্রণাম করে তারপর নিজে নিজে গন্তব্যে পৌঁছতেন। সাবর্ণ রায় চৌধুরীরা, জমিদারি পাওয়ার পর হালিশহর থেকে বড়িশা পর্যন্ত একটি বিশেষ রাস্তা তৈরি করেছিলেন। সেই রাস্তার জন্যই জঙ্গলের হিংস্র পশু ও চোর ডাকাদের উপদ্রব থেকে রক্ষা করে কালীঘাট মন্দিরে যাওয়ার জন্য পুণ্যার্থী-বণিকদের অনেক সুগম করেছিল। এই তীর্থ পথের একটি অংশ হিসেবেই তৈরি হয়েছিল উত্তর কলকাতার লাইফলাইন বলে পরিচিত লোয়ার চিৎপুর রোড যা বর্তমানে রবীন্দ্র সরণী নামে পরিচিত। তাই শুধু সতী পিঠের মাহাত্ম্যই নয় কলকাতার সামগ্রিক বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গেও কালীঘাটের কালী মন্দির অন্যতমভাবে সম্পৃক্ত।
কালের নিয়মে আদি গঙ্গায় আর জোয়ার ভাটা খেলে না বণিক বা ব্যবসায়ীদের নৌবহর চলা বন্ধ হয়েছে বহু যুগ আগেই। তবুও এলাকার প্রাচীন মিষ্টান্ন প্রতিষ্ঠান অথবা পটুয়া পাড়ার গাজন উৎসব আজও ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এই প্রসঙ্গে আপনাদের জানিয়ে রাখি এক লোকগাথার গল্প। কালীঘাট মন্দিরের অধীরে দেবনারায়ণ ব্যানার্জি লেনে রয়েছে হারান মাঝির ( ওরফে হারাধন মাঝি) মিষ্টির দোকান। প্রতিদিন কালীঘাট মন্দিরে সন্ধ্যা আরতির সময় এই হারাম মাঝির দোকান থেকেই মিষ্টি যায় কালীঘাট মন্দিরে। লাল রসগোল্লা ও কড়া পাকের সন্দেশ বরাদ্দ থাকে মা কালিকার জন্য। কালীঘাট মন্দিরের সেবাইত্রা জানিয়েছেন মা কালী যখন শয়নে যান তখন এই দোকানের চারটি মিষ্টি প্রতিদিন তাঁর হাতে দেওয়া হয়। যার প্রজন্মের বেশি সময় ধরে প্রায় দেড়শ বছরের কাছাকাছি হারান মাঝির এই মিষ্টির দোকান আজও সাবেকি ঘরানার। কোন ঝা চকচকে প্রলেপ দোকানে পড়েনি। এর পেছনেও রয়েছে স্বপ্নাদেশ। শোনা যায় দোকানের ঠিক বিপরীত দিকের সরু গলি, যেটি সরাসরি আদি গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। সেই পথ ধরে একদিন একটি ছোট্ট মেয়ে দোকানে এসে মিষ্টি খেতে চায়। তাকেই মিষ্টি দেন হারাধন মাঝি। মিষ্টি খেতে খেতেই নানা রকম গল্প করে সেই ছোট্ট মেয়েটি। এরপর যখন হারান মাঝি পয়সা চাইতে যায় তখন আচমকায় উধাও হয়ে যায় সেই ছোট্ট মেয়ে। সেদিন রাতেই স্বপ্নাদেশ পান হারাধন। প্রতিদিন সন্ধ্যা আরতির সময় যেন এই দোকান থেকেই মিষ্টি পৌঁছয়ে মা কালীর মন্দিরে এবং এই দোকান যে অবস্থায় রয়েছে ঠিক যেন সেই অবস্থাতেই থাকে, বলা হয় স্বপ্নাদেশে। তারপর থেকেই প্রতিদিন কালীঘাট মন্দিরের সন্ধ্যা আরতির সময় হারান মাঝির দোকান থেকে মিষ্টি যায় মন্দিরে। এবং আপনাদের অনুযায়ী দোকানের কোন অংশের এতটুকু পরিবর্তন করেননি উত্তরসূরীরা। এভাবেই নানা ইতিহাস তথা লোক গাথায় জড়িত কালীঘাটের এই কালীক্ষেত্র। সময় দাবি মেনে এই কালীক্ষেত্রে রূপটান পড়েছে, সংস্কারও হয়েছে ইতিমধ্যেই। আগামীকাল নববর্ষে নব রূপে সেজে উঠবে এই ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধ কালীমন্দির। তারই নবতম সংযোজন হবে আজ, স্কাইওয়াক।
