ভিআইপি নয়, সাধারণ মানুষই দীঘায় যাবেন জানালেন মুখ্যমন্ত্রী
দীঘার জগন্নাথ মন্দিরের স্টলে কালীঘাটের প্যারা
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ভগবান আর ভক্তের মেলবন্ধনে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিতে চান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে কারণেই হাজার হাজার মানুষের সমাগমে আগামী ৩০ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়র দিনে দীঘায় রাজ্য সরকারের উদ্যোগে যে জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন হতে চলেছে সেখানে ভিআইপি নয় সাধারণ মানুষ যাতে তাদের ধর্মস্থানে গিয়ে ইষ্ট দেবতাকে চাক্ষুষ করতে পারে তারই উদ্যোগ নিতে চায় রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ” মহা কুম্ভের ঘটনা মনে রাখতে হবে। বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক চাই না। অতীতের ঘটনা থেকেই তো শিক্ষা নিতে হয়। তাই সব মন্ত্রীরা দীঘায় যাবেন না। দিঘার অনুষ্ঠান স্থল থেকে কোলাঘাট এমনকি হাওড়া পর্যন্ত সমস্ত রাস্তা সি সি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলতে হবে।” আজ নবান্ন সভাঘরে দীঘার জগন্নাথ মন্দির ট্রাস্টকে সঙ্গে নিয়ে একটি বিশেষ বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে এই জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে ঘিরে সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা কেমন হবে, কি পদ্ধতিতে জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনী কর্মসূচি হবে, এই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হাজার হাজার মানুষের সুরক্ষা ব্যবস্থায় কি কি থাকবে তা নিয়ে একটি রোড ম্যাপ তৈরি হয় মুখ্যমন্ত্রীর পৌরহিত্যে। বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী জানান, দীঘার জগন্নাথ মন্দির নিয়ে প্রচুর মানুষের আগ্রহ আছে। শুধু রাজ্যে নয় দেশজুড়ে এমনকি বিদেশি ডাও এই মন্দির নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহী। সেক্ষেত্রে প্রায় ১২ হাজার মানুষ একসঙ্গে এই উদ্বোধনী কর্মসূচিতে হাজির থাকতে পারেন বলে আশা করছেন মুখ্যমন্ত্রী। মুখ্যমন্ত্রী জানান ” দীঘার জগন্নাথ মন্দির খুব বড় হলেও রাস্তা যথেষ্ট সংকীর্ণ। তাই একসঙ্গে বেশি মানুষের সমাগম হলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তাই রাজ্য সরকার এই অনুষ্ঠান নিয়ে বেশি হাইপ তুলতে চায় না।” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরপ্রদেশের মহা কুম্ভের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। কোন কোন মন্ত্রী কি কি দায়িত্বে থাকবেন সে কোথাও তিনি নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। কলকাতার দায়িত্বে থাকবেন রাজ্যের পুর ও নগর উন্নয়নমন্ত্রী তথা কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। হাওড়া দায়িত্বে থাকবেন রাজ্যের পূর্ত মন্ত্রীর পুলক রায়ের বেঁচে দেওয়া নির্দিষ্ট প্রতিনিধি। দীঘায় অনুষ্ঠান স্থলে ২৭ তারিখ থেকে থাকবেন রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, অরূপ বিশ্বাস, পুলক রায়, সুজিত বসু, ইন্দ্রনীল সেন ও স্নেহাশীষ চক্রবর্তী। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় “ভিআইপি কম সাধারণ মানুষ বা ভক্তবৃন্দ বেশি থাকবেন সেই ভাবেই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।” শুধু প্রশাসনিক দায় দায়িত্বই নয় পাঁচটি বোর্ডের যারা রয়েছেন যেমন পুরীর জগন্নাথ ধামের রাজেশ দ্বৈতাপতি, ইসকন মন্দিরের রাধারমন দাস, ভারত সেবাশ্রম সংঘ সহ সমস্ত সদস্যদের বিশেষ বিশেষ দায়িত্ব অর্পণ করেছেন রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান। কলকাতা থেকে দীঘা যাওয়ার পথে হাওড়া ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় কোথায় কোথায় তীর্থ যাত্রীদের জন্য জলের ব্যবস্থা মেডিকেল ক্যাম্প এবং এম্বুলেন্স থাকবে সেগুলোও নির্দিষ্ট করা হয় এই বৈঠকে। প্রতিটি জেলায় এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করার দায়িত্বে থাকবেন একজন করে নোডাল অফিসার। যেহেতু নিরাপত্তার স্বার্থে বহু মানুষের সমাগম চাইছে না রাজ্য সরকার তাই প্রতিটি ব্লকে ব্লকে দীঘার জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্ক্রিনের মাধ্যমে দেখানোর ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। উদ্বোধনী স্থলে ভিড় এড়াতে স্থানীয় ফাঁকা মাঠ বা পার্কে বড় জায়ান্ট স্ক্রিন লাগিয়ে এই উদ্বোধন কর্মসূচি দেখার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি। দীঘা রেল স্টেশনে যাতে পৃষ্ঠ হওয়ার মতো অবস্থা না হয় সে ব্যাপারেও জেলা প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যদিও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সুরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হলেও কেউ কেউ অশান্তি বাধাতে চায় বলে আক্ষেপ করেন মমতা। কাঁথিতে জয়েন্ট স্ক্রিনের ব্যবস্থা করে স্থানীয় মানুষকে এই উদ্বোধনী কর্মসূচি দেখানোর প্রসঙ্গে সরাসরি কারো নাম উল্লেখ না করে মমতা বলেন” আমরা শান্তিতে সমস্ত কর্মসূচি পালন করতে চাই। কিন্তু কেউ কেউ তা চায় না। শান্তিতে অনুষ্ঠান সম্পন্ন হোক তা তারা চায় না। সে ব্যাপারে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।”
মুখ্যমন্ত্রী জানান আগামী ৩০ এপ্রিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিন মন্দিরে জগন্নাথ দেবের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হবে সকাল 11 টায়। প্রাণ প্রতিষ্ঠা করবেন পুরীর জগন্নাথ ধামের রাজেশ দ্বৈতাপতি। সেদিনই মুখ্যমন্ত্রী এই জগন্নাথ মন্দিরের দ্বারদঘাটন ও উদ্বোধন করবেন। তার আগে ধর্মীয় রীতি মেনে ২৯ এপ্রিল যজ্ঞ হবে যা পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন রাজেশ দ্বৈতাপতি। মন্দির উদ্বোধন কর্মসূচি সম্পূর্ণ হলে তা হস্তান্তর করা হবে ইসকন কর্তৃপক্ষের হাতে। উদ্বোধন কর্মসূচি শেষ হলে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাও থাকছে দিঘার জগন্নাথ মন্দিরে। যেখানে অংশ নেবেন ডোনা গঙ্গোপাধ্যায়, জিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, অদিতি মুন্সি, শ্রীরাধা বন্দোপাধ্যায় দের মত শিল্পীরা। মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বারের সামনে দুটি ক্লক রুমের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়াও আরো অতিরিক্ত দুটি ক্লক রুমের ব্যবস্থা থাকবে দুপাশে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত চারটি হ্যাঙ্গারের ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য” দীঘায় এই নতুন ধর্ম ক্ষেত্র জগন্নাথ মন্দির তৈরীর পরিকল্পনা বহুদিনের। পুরীর মত বাংলাতেও এ ধরনের একটি ধর্মস্থান থাকবে যাকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র তৈরি হবে এবং তৈরি হবে প্রচুর কর্মসংস্থান। সেই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের অনুষ্ঠান যাতে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়, তার জন্য রাজ্য সরকার সামগ্রিক ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
উল্লেখযোগ্য, ধর্মীয় মত অনুযায়ী যেহেতু জগন্নাথ দেবের প্রসাদ মা কালী কে অর্পণ করার পরেই তা মহাপ্রসাদ হয় তাই এই মন্দিরের সন্নিহিত এলাকায় কালীঘাটের প্যারার স্টল করা হবে। থাকবে শুকনো গজা এবং পুরীর জগন্নাথ ধামের আদলে ধ্বজার স্টলও। মুখ্যমন্ত্রী জানান, জগন্নাথ মন্দির তৈরির জন্য দান, ধ্যান, দক্ষিণা কিছু পাইনি। মন্দির খুললে সোনার ঝাড়ুর জন্য ৫ লাখ ১ টাকাও আমার একাউন্ট থেকেই দেব।”
