একটা সময় ছিল, যখন মানুষ পরিচিত হতো তার কাজে, না যে ধর্মে সে জন্মেছে। মেদিনীপুরের পাথরার সেই ছোট্ট গ্রামে জন্মেছিলেন ইয়াসিন পাঠান—একজন মুসলিম, যিনি হিন্দুদের ভাঙাচোরা প্রাচীন মন্দিরগুলিকে ‘প্রাণ’ দিয়েছিলেন। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, নিজের পয়সা খরচ করে, প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরে এনে দিয়েছিলেন মন্দিরের মর্যাদা। তাঁর এই অনন্য কর্মের জন্য রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মা তাঁকে ‘কবীর সম্মান’ দিয়েছিলেন।
কিন্তু আজ?
৭২ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে, হৃদয়ে ব্লক, কিডনিতে ক্ষয়, আর মনভাঙা স্মৃতি নিয়ে ইয়াসিন পাঠান বলছেন—”ক্ষমা করো ঈশ্বর, হয়তো ভুল করেছিলাম মন্দির বাঁচিয়ে!”
সম্প্রীতির জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই মানুষটা আজ আর সাহস পান না নিজের নামে হওয়া নাটক দেখতে যেতে, কারণ চারপাশে ছড়িয়ে গেছে ভয়, বিভাজন, হিংসা। ভাইয়ে ভাইয়ে ফাটল ধরছে রাজনীতির মেরুকরণে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া হিংসার দৃশ্য দেখে তিনি আতঙ্কে শিউড়ে উঠছেন।
তিনি বলেন, এই দেশটা তো ছিল মিলেমিশে থাকার জন্য। এখন প্রশ্ন জাগে, বেঁচে থাকার মতো জায়গা কি আছে আর?
পাথরায় ৪২টি মন্দিরের পুনর্গঠন, এএসআই-এর হস্তক্ষেপ, পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃতি সবটা তাঁর একাগ্রতার ফসল। অথচ এখন সেই সম্প্রীতির মাটিতেই ছড়িয়ে পড়ছে ঘৃণার বিষ।
এবং তাই, চুপ করে বসে না থেকে, এক নীরব কিন্তু বজ্রঘাতের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইয়াসিন পাঠান—রাষ্ট্রপতির দেওয়া কবীর সম্মান তিনি ফেরত দিচ্ছেন।
এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি পদকের প্রত্যাখ্যান নয়, এটি এক জেগে থাকা বিবেকের প্রতিবাদ, একটি সময়ের মুখে ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন—ভালোবাসা কি শেষ হয়ে গেল?
সম্প্রীতির মূর্ত প্রতীক ইয়াসিন পাঠান হয়তো পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেন, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও ইতিহাসের দেওয়ালে অক্ষয় হয়ে রইল।
