অভিজিৎ বসু
লোক মরলে ভীড় বারে। শোকের বাড়িতে রাজনৈতিক দাদা আর দিদিদের ভীড় বাড়ে। মার কোল থেকে বাচ্চা কেড়ে নিয়ে শিশুকে জোর করে আগলে বুকে নিয়ে চলা মানুষের ভীড় বারে। লোক দেখানো এই সব নানা বিষয়কে ঘিরেই ভীড় উপচে পড়ে শোকের আবহে। শোকের আবর্তে ঘুরপাক খাই আমরা। এদিক থেকে ওদিক। কান্না ভেজা কণ্ঠ, বাড়ীর প্রিয়জন এর ছেড়ে চলে যাওয়া, কে দেহ আনবে কোন রাজনৈতিক দলের হাতে থাকবে সেই দেহের অধিকার সেই নিয়ে দড়ি টানাটানি আর গম্ভীর শোকে পাথর পরিবেশ।
শোক আমাদের বিহ্বল করে দেয়। সেই বিহ্বলতা কাটিয়ে ভীড় এড়িয়ে আবার বেঁচে থাকা। একা একাই বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। দিন কয়েক একটু নানা জনের আনাগোনা সাথে একটু সমবেদনা আর দু চারটে সহানুভূতির টুকরো টুকরো কথা। রাজনৈতিক নেতাদের একে অপরকে দোষারোপের পালা করে এগিয়ে চলা আর তার মাঝে প্রিয়জনের স্মৃতির জারক রসে জারিত হওয়া, নিমজ্জিত হওয়া, ডুবে যাওয়া, অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়া। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে মনে করে কেঁদে ফুঁপিয়ে ওঠা। এটাই যে জীবন যে জীবনে জড়িয়ে ছিল সুখ, ভালোবাসা, প্রেম, একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকা হঠাৎ করেই সব কিছু থেমে যায় বন্দুকের গুলি বিদ্ধ দেহের সামনে।
আসলে জীবন আর মৃত্যু। আসলে জীবন নামক নদীর উপল উপত্যকা ধরে এগিয়ে চলা নদীর তীর ধরে, পাখির ডাক শুনে, বেঁচে থাকা রঙিন স্বপ্ন বুনে। এক জীবন কেমন অন্য জীবনকে আগলে রাখে। বুকে জড়িয়ে রাখে। আর সেই আগলে রাখা, স্বপ্ন দেখা জীবন কেমন একনিমেষে শেষ হয়ে যায়। ঝাঁঝড়া হয় গুলিতে নির্দয় ভাবেই। যে জীবন এই ভাবে শেষ হতে পারে না মনে করেই আবার কেমন স্মৃতি রোমন্থন করে ভীড় কাটিয়ে এগিয়ে চলা। যেখানে আর কেউ নেই একা একদম একা।
কফিন বন্দী মৃতদেহের সারি, ভীড় উপচে পড়া নেতা নেত্রীর ফোনালাপ, ফুলের মালায় আর গার্ড অব অনার দিয়ে ভালবাসার মানূষকে সম্মান জানিয়ে বিদায় দেওয়া, রাজনৈতিক দলের নেতাদের নেত্রীদের একে অপরকে ঠেলে এগিয়ে চলা সব কিছুর মাঝেই কেমন যেনো থমকে দাঁড়িয়ে পড়া। শোকের অভিঘাতে আহত হয়ে ফের বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। যেখানে হিন্দু নেই, মুসলমান নেই, জাত নেই, ধর্ম নেই, রাজনীতি নেই, মৃতদেহকে নিয়ে টানাটানি নেই একে অপরকে দোষারোপ নেই। শুধু মাত্র একটি জীবন অন্য জীবনকে ছেড়ে চলে যাওয়া আছে। কান্না আছে, দুঃখ, কষ্ট যন্ত্রণা সহ্য করে বেঁচে থাকা আছে। যে বেঁচে থাকার স্বাদ বড়ো নোনতা। যে বেঁচে থাকার স্বাদ বড়ই আলুনি। ভিড়ের মাঝে সংগোপনে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা।
