সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
কলকাতার জোড়াসাঁকো থানার মদনমোহন বর্মন স্ট্রিটের হোটেলে আগুন নিয়ে একাধিক প্রশ্নের উত্তর অমিল। বহু চর্চিত অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থার যে সরকারি শর্ত তা এই হোটেলে মান্যতা পেয়েছিল কি? অগ্নিবিধি সুরক্ষায় যে যে ব্যবস্থাপনা নেওয়া প্রয়োজন তা হোটেল কর্তৃপক্ষ নিয়েছিল কিনা তা নিয়েও সন্দেহ প্রকট হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কিসের ভিত্তিতে এই ঘিঞ্জি এলাকায় এ ধরনের হোটেল চালানোর অনুমতি দিয়েছে দমকল বা প্রশাসন? এখনো পর্যন্ত এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৫ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। এতগুলো প্রাণের দায় নেবে কে এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা থেকে প্রত্যক্ষদর্শী সকলেই জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ড বা বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটলে আপৎকালীন নির্গমন বা বেরোনোর পথ যেভাবে থাকা উচিত তা এই হোটেলে আদৌ ছিল না। ঝিনঝি এলাকায় ছয় তলা এই হোটেলে ধোঁকা বেরোনোর জন্য একটিই সিঁড়ি। যদিও দমকল বিধিতে ধোকা এবং বেরোনোর আলাদা রাস্তা থাকার কথা। আপদকালীন নির্গমনের জন্য পৃথক ফায়ার করিডোর বা এমার্জেন্সি এক্সিট রাখতে হবে। সেই সমস্ত শর্ত এই হোটেলে বিন্দুমাত্র মান্যতা পায়নি। পাশাপাশি অগ্নি নির্বাপক যন্ত্র বা ফায়ার এক্সটিংগুইসারগুলি বাতিল বা এক্সপায়ার হয়ে গেছে কিনা সেটাও তদন্ত সাপেক্ষ। অগ্নি নির্বাপক যন্ত্রের ব্যবস্থা থাকলেও তা নামমাত্রই বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। যেহেতু ধোঁকা বেরোনোর একটিই রাস্তা এবং হোটেলের দোতলা থেকেই আগুন ছড়ায় তাই তিন তলা চারতলা পাঁচতলা বা ছয় তলায় যারা ছিলেন তারা নিচে নামতে পারেননি। কোন আপৎকালীন নির্গমন পথ না থাকায় ঘর বন্দী হয়ে পড়েন তারা। স্বাভাবিকভাবেই আগুনের লেলিহান শিখা এবং ঘন কালো ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে অনেকেরই মারা যাওয়ার আশঙ্কা। এই অবস্থায় উপর থেকে নিচে ঝাঁপ দিতে গিয়ে বা প্রাণ হাতে নিয়ে নিচে নামতে গিয়ে মৃত্যু বা গুরুতর যখন হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে অপরিসর ও অবিন্যস্ত ভাবে ঘিঞ্জি এলাকায় এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান তৈরীর বৈধতা নিয়েও। আবাসিক হোটেল চালানোর মতো আদর্শ পরিস্থিতি না থাকা সত্ত্বেও কিভাবে হোটেলের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে তা নিয়েও সন্দেহ দানা বেঁধেছে। সর্বোপরি লাগোয়া বড়বাজার এলাকাতেই রয়েছে নন্দরাম মার্কেট। ২০০৮ সালে এই নন্দরাম মার্কেটে বিধ্বংসী আগুনের কথা আজও দগদগে গোটা বড়বাজার ও উত্তর কলকাতা এলাকায়। ২০১৯ সালে ফের নন্দরম মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এরপরে বড় বাজারের বাগরি মার্কেটের একাংশ ভষ্মিভূত হওয়ার ঘটনাও ভোলেননি কেউ। নন্দলান থেকে বাগরি মার্কেট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে বহুবিধ ব্যবস্থার কথা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। শাস্তির খাড়া আরও কড়া করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বা সরকারি ভিজিট করার কোথাও উল্লেখ করা হয়। অথচ কার্যক্ষেত্রে তার প্রতিফলন কতটা মিলেছে তা একের পর এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বেআব্রু হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীদের গাফিলতি নিয়ে বিস্তর অভিযোগ থাকলেও সরকারি উদাসীনতা বা ব্যবস্থাপনা গত ত্রুটির অভিযোগটাও দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। নন্দরাম থেকে বাগরি মার্কটের ঘটনার পরও সরকারি কর্তা ব্যক্তিদের কবে হুঁশ ফিরবে সেটা যেমন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে তেমনি সরকারি আশ্বাসের প্রতি অনাস্থা প্রকট হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের। এতগুলো প্রাণহানির দায় কে নেবে এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে রবীন্দ্র সরণীর মদনমোহন বর্মন স্ট্রিটে।
যদিও এই মুহূর্তে দীঘায় জগন্নাথ মন্দির উদ্বোধনের রাজসূয় যজ্ঞ চলছে। মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশ মন্ত্রী থেকে দমকল মন্ত্রী সকলেই দীঘায় সেই রাজকীয় আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত। কলকাতায় ১৫ জনের প্রাণহানির ঘটনা নিয়ে টেলিফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও ধরা যায়নি দমকলমন্ত্রী সুজিত বসুকে। যদিও দমকল আধিকারিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দমকল মন্ত্রী নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।
