মঙ্গলবার গভীর রাত। সময় তখন ১টা ৫ মিনিট থেকে ১টা ৩০-র মধ্যে। ভারতীয় সেনা বাহিনী চুপিসারে পাকিস্তান এবং পাক-অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকে একের পর এক জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেয়। এই অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন সিঁদুর’। কেন্দ্রীয় সরকার পরদিন সকালেই সাংবাদিক সম্মেলন করে এই অভিযান সম্পর্কে জানিয়ে দেয় যে, মোট ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি— যার মধ্যে ৪টি পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডে এবং ৫টি পিওকে-তে— সফলভাবে নিশানা করা হয়েছে। এই অভিযানে অংশ নেন ভারতীয় বায়ুসেনা, সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থা মিলিয়ে একটি যৌথ বাহিনী। কর্নেল সোফিয়া কুরেশি, উইং কমান্ডার ব্যোমিকা সিং এবং বিদেশ সচিব বিক্রম মিস্রী এই অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত জানান সংবাদমাধ্যমকে।
এই ঘটনার পরেই দেখা যায় পাকিস্তানের তরফে এক অদ্ভুত পরস্পরবিরোধী সুর। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খোয়াজা আসিফ ব্লুমবার্গ টেলিভিশনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, “আমরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ চাই না, কিন্তু যদি হামলা হয়, তার উপযুক্ত জবাব অবশ্যই দেওয়া হবে।” এর সঙ্গে তিনি এ-ও বলেন, ভারত যদি উত্তেজনা প্রশমন করে, তবে পাকিস্তানও আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত। তবে কূটনৈতিক মহলে এই বক্তব্য নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলে, পাকিস্তান বারবার এই ধরনের ‘শান্তির বার্তা’ দেয় শুধুমাত্র নিজেদের অবস্থানকে রক্ষা করার জন্য, আন্তর্জাতিক মহলে চাপে পড়লে অথবা নিজেদের ভিতরে রাজনৈতিক দুর্বলতা ঢাকতে।
এই অভিযানে যেসব জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়, সেগুলির নাম উঠে এসেছে সরকারিভাবে। জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মারকাজ সুভান আল্লাহ, সারজাল, তেহরা কালান, মারকাজ আব্বাস, কোটলি এবং সৈয়দনা বিলাল ক্যাম্প, মুজফফরাবাদ। লস্কর-ই-তইবার ঘাঁটি ছিল মারকাজ তৈবা, মুরিদকে, সোওয়াই নাল্লা ক্যাম্প, এবং বারনালায় অবস্থিত মারকাজ আহলে হাদীস। এছাড়া হিজবুল মুজাহিদিনের দুটি ঘাঁটি ছিল সিয়ালকোটের মেহমুনা এবং কোটলির মাসকার রাহিদ শাহিদ। এগুলি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কিছুদিন আগেই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকারে স্বীকার করে নিয়েছিলেন যে, পাকিস্তান জঙ্গিদের মদত দেয়। তাঁর বক্তব্য ছিল, “আমরা জঙ্গিদের সাহায্য করেছি, কারণ আমেরিকার চাপে তা করতে হয়েছে।” এই স্বীকারোক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যথেষ্ট শোরগোল পড়ে যায়, এবং পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন ওঠে। ফলে এ কথা বলাই যায়, যে পাকিস্তানের বর্তমান সুর নরম করা আসলে ভারতীয় কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের ফল।
ভারতের এই অভিযান শুধু শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করেই থেমে থাকেনি, বরং তা পাকিস্তানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও সীমান্তে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোনও আপস চলবে না। পাকিস্তান যতই ‘শান্তির বার্তা’ দিক না কেন, যদি সে নিজের ভূখণ্ড থেকে জঙ্গি কার্যকলাপ বন্ধ না করে, তাহলে ভারতের তরফে ভবিষ্যতেও আরও কঠিন পদক্ষেপের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অপারেশন সিঁদুর ভারতীয় প্রতিরক্ষা নীতির নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক— যেখানে প্ররোচনার জবাবে শুধু কূটনীতি নয়, প্রয়োজনে সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সামরিক পদক্ষেপও ব্যবহার করা হবে। পাকিস্তান এই সুর নরম করে ঠিক কতটা আন্তরিক, তা সময়ই বলবে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সীমান্তে শান্তি চাইলে সন্ত্রাসে সমর্থন বন্ধ করতেই হবে। প্রশ্ন হল, পাকিস্তান আদৌ সেই পথে হাঁটবে তো? নাকি এই শান্তির বার্তা শুধুই এক নতুন কূটনৈতিক প্রতিচাল?
