ইতিহাসের বুঝি এমনই নিয়ম! এক সময় ভোটের রাজনীতিতে যে দলের আধিপত্যে বিরোধীদের খুঁজে পাওয়া যেত না সেই দলই আজ নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে প্রতিবেশী দেশ থেকে।রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর এবার ভোটেও নিবন্ধন করতে পারবে না শেখ হাসিনার দল। সোমবারই আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ সোমবার রাতে বলেন, ‘আজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, তার অঙ্গ সংগঠন এবং ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ইলেকশন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করা হলো।…’
গত শনিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনের সংশোধনী অনুমোদন করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই আন্দোলনের নেতা ও কর্মীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সাক্ষীদের সুরক্ষার কথা ভেবে আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। শেখ হাসিনাদের বিচারপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের সমস্ত কার্যকলাপে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
আসলে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠতে শুরু করে।এই দলের ছাত্রশাখা ‘বাংলাদেশ ছাত্র লীগ’কে আগেই নিষিদ্ধ সংগঠন হিসাবে ঘোষিত হয়েছিল।তবে বিভিন্ন দলের চাপ থাকলেও নানা কারণে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তেমন পদক্ষেপ করা হয়নি। তবে বেশ কিছু দল অন্তর্বর্তী সরকারের উপর নানাভাবে চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি শাহবাগে আন্দোলনও শুরু হরে দেয় এই ইস্যুতে।ইউনুস সরকার তাদের আশ্বস্ত করে জানান, এবিষয়ে ভাবনাচিন্তা করা হচ্ছে, কেউ যেন হঠকারী কোনও সিদ্ধান্ত না নেয়।
আওয়ামী লীগের কেন এমন দশা হল?
কিন্তু প্রশ্ন হল কেন এমনটা হল? কেন এত বড় একটা দলের বিরুদ্ধে চলে গেল বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশের মানুষ? শেখ হাসিনা বার বার দলকে সঙ্ঘবদ্ধ করে ফের ফেরার বার্তা দিলেও তা বিন্দুমাত্র কেন সফল হতে পারল না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আসলে অনেকে মনে করছেন বিরাট বিপুল দলের এমন পরিণতির জন্য শেখ হাসিনাই দায়ী। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার যেটুকু সম্ভাবনা ছিল, তা শেখ হাসিনা নিজেই শেষ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের কিছু সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ হাসিনার চরম দাম্ভিকতা এবং প্রতিবিপ্লব ঘটানোর দুঃস্বপ্ন পুরো দলকে বিপদের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলাদেশের বিখ্যাত যুগান্তর পত্রিকা লিখেছে,“গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট জীবন নিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলেও দেশে রেখে যাওয়া দল এবং দলের নেতাকর্মীদের বাঁচাতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেননি শেখ হাসিনা। জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ ক্ষমতায় থাকার সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসন ও লুটপাটের জন্য তার উচিত ছিল জাতির কাছে ভুল স্বীকার করে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া। কিন্তু সেটি না করে উল্টো ভারতে বসে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করার জন্য অব্যাহতভাবে দলের নেতাকর্মীদের উসকানি দিয়েছেন। প্রতিবিপ্লব ঘটিয়ে দলের সবাইকে রাস্তায় নেমে আসার নির্দেশও দেন। যদিও তার এমন উসকানিতে সাড়া দিতে গিয়ে অনেকে এখন কারাগারে। বাকিরা নতুন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।”
ফের ফিরতে পারবে আওয়ামী লীগ?
হিসেব মত আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হলে বা চূড়ান্তভাবে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলে আওয়ামী লীগের পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। তবে দলকে নিষিদ্ধ না করে দলীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে সেদেশে।এমন পরিস্থিতিতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ কী করতে পারবে আর কী করতে পারবে না কিংবা এই আইনের ব্যাপ্তি কতটা হবে- তা নিয়েই বেশি কৌতূহল দেখা যাচ্ছে। কারণ দল বৈধ হলে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানো তার আইনি অধিকারের মধ্যে পড়ে বলে মনে করছেন বাংলাদেশের অনেক আইনজীবী।
আবার অনেকে তলানি থেকে এই রাজনৈতিক দলের আসা নিয়ে একেবারে নিরাশ হতে নারাজ।কেননা বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো এই রাজনৈতিক দল এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি এবারই প্রথম হয়নি। ইতিহাস জানাচ্ছে দল এর আগেও বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক সংকট ও সামরিক শাসনের মুখে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লেও ফের সংগঠিত হয়ে রাজনীতিতে ফিরে এসেছে। তবে এবার জুলাই আন্দোলনের পর জনগণ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার দল কোন পথে ফিরতে পারবে সে নিয়ে জল্পনা থাকছেই।
