ইতিহাস সৃষ্টি করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।মধ্যপ্রাচ্যে এক ঘূর্ণিঝড়ের মতো সফরে বেরিয়ে সৌদি আরবে তিনি সাক্ষাৎ করলেন সিরিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতি আহমাদ আল-শারার সঙ্গে। মামুলি দৃষ্টিতে একে দুই রাস্ট্র নেতার সাক্ষাৎ বলে মনে হলেও ট্রাম্পের এত বৈঠকের মধ্যে এই বৈঠকটিই সম্ভবত সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এই ঘটনা আমূল বদলে দিতে পারে মধ্য ও পশ্চিম এশিয়ার ভূরাজনীতির গতিপথ।
কে এই আহমাদ আল-শারা?
আহমাদ আল-শারার বিতর্কিত অতীতই এই বৈঠক ঘিরে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলার প্রথম কারণ। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তিনি পরিচিত ছিলেন সন্ত্রাসী আবু মোহাম্মদ আল-জাওলানি বা আল-গোলানি, বা আল-জৌলানি নামে। রাষ্ট্রসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে ঘোষিত করেছিল। গত দু- দশকে তিনি আল-কায়দা ও আইএসআইএস-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ‘আইএস ও আল-কায়েদা নিষেধাজ্ঞা কমিটি’ ২০১৩ সালের জুলাই মাসে তাকে বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসী ঘোষণা করে। ইউনাইটেড নেশনস-এর মতে তিনি অস্ত্র যোগান, বিক্রি এবং বিতরণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একই সঙ্গে আল-কায়েদা ও আইএস-এর হয়ে সদস্য সংগ্রহও করতেন। তিনি একসময় আল-কায়েদার নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি এবং পরে আইএস নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির সরাসরি সহযোগী ছিলেন।
২০১১ সালে সিরিয়ায় রাশিয়া ও ইরান-সমর্থিত বাশার আল-আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু হলে, বাগদাদি জাওলানিকে সিরিয়া ও ইরাকে আল-কায়েদার শাখা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। এর পর ২০১২ সালে জাওলানি ‘আল-নুসরা ফ্রন্ট’ গঠন করেন, যা পরে ‘জভাত ফাতাহ আল-শাম’-এ রূপান্তরিত হয়—এটিও একটি সন্ত্রাসী সংগঠন।
সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন
২০১৭ সালে এই সংগঠন নতুন নামে পরিচিতি পায়। হয় হায়াত তাহরির আল-শাম বা এইচটিএস। লক্ষ্য ছিল একটাই – বাশার আল-আসাদ সরকারকে উৎখাত করে ইসলামিক খেলাফত প্রতিষ্ঠা। ২০২৪ সালের নভেম্বরে এইচটিএস-এর হঠাৎ বিশাল আক্রমণেই আসাদ বাহিনী দ্রুত এলাকা হারাতে থাকে। ৮ ডিসেম্বর, ২০২৪-এ বাশার আল-আসাদ রাশিয়ায় পালিয়ে যান এবং ৫৩ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। জানুয়ারিতে আহমাদ আল-শারার নামে জাওলানি অন্তর্বর্তী রাষ্ট্রপতি হন।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ট্রাম্পের স্বীকৃতি
সৌদি আরবে ট্রাম্প-শারার বৈঠকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিরিয়ার ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা করেছেন। ১৯৭৯ সাল থেকে সিরিয়া ‘সন্ত্রাসবাদে মদতদাতা রাষ্ট্র’ হিসেবে মার্কিন কালো তালিকাভুক্ত ছিল। এদিন ট্রাম্প জানান, “আহমাদ আল-শারার নেতৃত্বে সিরিয়া শান্তির একটি নতুন সুযোগ পেতে পারে।” এই বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতেও সিরিয়ার নতুন সরকারকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উদ্যোগে এই বৈঠক আয়োজিত হয়। এটিও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। ট্রাম্প প্রকাশ্যে সৌদি নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এই বৈঠকের সময় ফোনে ছিলেন ট্রাম্প ও শারার সঙ্গে। পাশাপাশি, অনেক উপসাগরীয় দেশ সিরিয়ার নতুন সরকারকে ইরানের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে তাকে সমর্থন জানিয়েছে। বৈঠকের পর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট শারাকে আহ্বান জানিয়ে বলেন যাতে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং সিরিয়া থেকে সকল বিদেশি জঙ্গিকে উৎখাত করেন। সিরিয়ার বিদেশমন্ত্রক ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণাকে “একটি যুগান্তকারী মোড়” বলে অভিহিত করেছে।
