সরকারি বেসরকারি গাঁটছড়ায় মেডিকেল কলেজ
চিকিৎসক-রোগী অনুপাতে সামঞ্জস্য রাখতে নয়া নীতি রাজ্যের
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্পের পাশাপাশি রাজ্য সরকারের বিভিন্ন স্বাস্থ্য স্কিমের কারণে রাজ্যের হাসপাতালগুলোতে যেমন রোগীর চাপ বাড়ছে তেমনি চিকিৎসকের অভাবও দিন দিন প্রকট হচ্ছে। সর্বভারতীয় পরীক্ষার মাধ্যমে ডাক্তারি পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়লেও রাজ্যে প্রয়োজনীয় মেডিকেল কলেজ এবং উপযোগী পরিকাঠামোর অভাব রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরের কাছে মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজ্যের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তো বটেই এমনকি পিপিপি মডেলের হাসপাতালগুলিতে স্বাস্থ্য শিক্ষার যে ব্যবস্থা রয়েছে তা পর্যাপ্ত নয়। এমতাবস্থায় রাজ্যের স্বাস্থ্য শিক্ষার পরিকাঠামো বাড়াতে বেসরকারি স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য। ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের শর্ত অনুযায়ী কোন হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতি পেতে হলে নিদেনপক্ষে ৩০০ অথবা তার বেশি শয্যা থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যায় চিকিৎসক শিক্ষক, এ্যানাটমিসহ সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো থাকা প্রয়োজন। রাজ্যে নির্মিত এবং নির্মীয়মান বহু বেসরকারি উদ্যোগের হাসপাতাল যাদের নিজস্ব জমি-বিল্ডিং থাকা সত্ত্বেও ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের শর্ত পূরণে সমস্যা রয়েছে। রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বার্থে সরকারি উদ্যোগে বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে এই শর্ত পূরণে সাহায্য করতে রাজি রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। এমনকি সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো ব্যবহার করে কোনও বেসরকারি উদ্যোগ যদি স্বাস্থ্যশিক্ষার প্রসারে উদ্যোগী হয় তাহলে ইউজার চার্জের বিনিময়ে সরকারি পরিকাঠামো ব্যবহার করতে দিতেও রাজি রাজ্য সরকার।
রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর জানিয়েছে ইতিমধ্যেই বহু বেসরকারি উদ্যোগের পক্ষ থেকে এই ধরনের প্রস্তাব রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তরে এসে পৌঁছেছে এবং তাদের কাছে expression of interest চেয়ে পাঠানোর প্রক্রিয়াও সম্পূর্ণ হয়েছে। স্বাস্থ্য দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ওই বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছে পরিকাঠামোগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের শর্ত অনুযায়ী অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি পূরণ করবে রাজ্য। ইতিমধ্যেই তিনটি ক্যাটাগরিতে ইউজার চার্জ নির্ধারণ করেছে রাজ্য সরকার। মূলত কর্পোরেশন এলাকায় শয্যাপ্রতি মাসিক ১৫০০০ টাকা, মিউনিসিপ্যালিটি এলাকায় শয্যাপ্রতি মাসিক ১২ হাজার টাকা এবং অন্যান্য এলাকায় শয্যাপ্রতি মাসিক ১০ হাজার টাকা ইউজার চার্জ হিসেবে ধার্য করেছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর। শুধু তাই নয়, সরকারি প্রস্তাবে জানানো হয়েছে, ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের শর্ত অনুযায়ী কোন হাসপাতালকে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় শর্তপূরণে যে পাঁচ বছর সময় দেওয়া হয় সেই সময় মেয়াদ সর্বাধিক ৩৩ বছর পর্যন্ত করা হবে বলেও জানানো হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে যদি তারা নিজস্ব পরিকাঠামো তৈরি করতে পারে সেক্ষেত্রে তাদের মেডিকেল কলেজের স্বীকৃতি মিলবে। উল্লেখযোগ্য গত ফেব্রুয়ারির বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনেও বিভিন্ন দেশি-বিদেশি বেসরকারি উদ্যোগও স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগে আগ্রহ প্রকাশ করে। রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় চিকিৎসক-রোগীর অনুপাতে সামঞ্জস্য আনতে এ ধরনের উদ্যোগ যত কার্যকরী হবে ততই রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার স্বাস্থ্য উন্নত হবে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
উল্লেখযোগ্য, রাজ্যের স্বাস্থ্যপরিকাঠামো এবং রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা বা চিকিৎসার চাহিদা এই দুইয়ের অনুপাতে রাজ্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় MBBS এর সিট যেমন বৃদ্ধির প্রয়োজন তেমনি চিকিৎসা শিক্ষার পরিকাঠামো সহ আরও মেডিকেল কলেজের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বর্তমানে রাজ্যে ৩৭টি মেডিকেল কলেজে ৫,৬৫০ MBBS সিটের ক্ষমতা রয়েছে। পাঁচটি নির্মীয়মান মেডিকেল কলেজ সম্পূর্ণ হলে ক্ষমতা আরও বাড়বে তবে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছে রাজ্য স্বাস্থ্য দপ্তর।
কারণ রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় শুধু রাজ্যবাসী নয় পূর্ব ও পূর্বোত্তর প্রতিবেশী রাজ্য এমনকি প্রতিবেশী দেশের চাপও সামলাতে হয় পশ্চিমবঙ্গকে। এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসক-রোগীর অনুপাত দিন দিন অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ছে বলে মত রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তাদের। স্বাস্থ্য পরিষেবার সামগ্রিক চাহিদা মেটাতে তাই বেসরকারি উদ্যোগের মেডিকেল কলেজ তৈরির প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়েছে। তাই রাজ্যের স্বাস্থ্য চাহিদার যোগান মেটাতে বেসরকারি হাসপাতালগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে গাঁটছড়া বেঁধে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চায় রাজ্য সরকার। ইতিমধ্যেই ন্যাশনাল মেডিকেল কাউন্সিলের সঙ্গে আলোচনা করে বেসরকারি উদ্যোগে মেডিকেল কলেজ তৈরির ক্ষেত্রে শর্ত পূরণের শিথিলতার ব্যবস্থাও করেছে রাজ্য।
