২২ এপ্রিল, কাশ্মীরের পহেলগাওয়ে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াবহ সন্ত্রাসবাদী হামলা। তারই জবাব দিতে পাল্টা পদক্ষেপ নেয় ভারত। পাকিস্তানে এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ঢুকে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে দেয়। ঠিক সেই মুহূর্তেই ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সেই অতুলনীয় সাহসিকতাকে আরও একবার স্মরণ করল দেশবাসী । প্রতিদিন সারা দেশের মানুষ যে শান্তিতে ঘুমাতে পারে, তার পেছনে রয়েছে এদেশের সেনা বাহিনীর নির্ঘুম রাত্রি, প্রহরা। তাদেরই একজন ক্যাপ্টেন ইয়াশিকা হাতওয়াল ত্যাগী।
কার্গিল যুদ্ধের কথা মনে পড়লেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঁচু পর্বতচূড়ায় যুদ্ধরত সাহসী সৈনিকদের ছবি। কিন্তু এই যুদ্ধের এক অদৃশ্য ফ্রন্টে, আরেক যোদ্ধা ছিলেন। এক নারী, যিনি সেই সময় গর্ভবতী অবস্থায় থেকেও সেনা উর্দি গায়ে চাপিয়ে দেশের জন্য লড়েছেন। তিনি ক্যাপ্টেন ইয়াশিকা ত্যাগী, ভারতীয় সেনাবাহিনীর এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
১৯৯৯ সালের গ্রীষ্মে যখন কার্গিল যুদ্ধ তুঙ্গে, তখন ক্যাপ্টেন ইয়াশিকা ছিলেন গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে। কিন্তু এই চরম অবস্থাতেও তিনি নিজেকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখেননি। লেহ-এ নিযুক্ত প্রথম মহিলা লজিস্টিক অফিসার হিসেবে, যুদ্ধের সময় সৈন্যদের জন্য রেশন ও অন্যান্য সামরিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ইয়াশিকা। একদিকে নিজের সন্তানকে গর্ভে ধারণ করছেন, অন্যদিকে দেশমাতৃকার সন্তান সেনাদের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত তিনি। এটা শুধু কর্তব্য নয়, এক অনন্য ত্যাগ।
ইয়াশিকা ত্যাগীর জন্ম দেরাদুনে সামরিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা। বাবা ছিলেন কর্নেল, যিনি ১৯৬২, ১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং পরে শহিদ হন। মাত্র সাত বছর বয়সে ইয়াশিকা দেখেন, তাঁর বাবার মরদেহ একটি সেনা ট্রাকে মালা দিয়ে সজ্জিত করে বাড়িতে আনা হচ্ছে। শিশুমনে সেই দৃশ্য গেঁথে যায় চিরতরে।
পরিবার থেকে পাওয়া শ্রদ্ধা ও সম্মানের সেই স্মৃতি ইয়াশিকার মনে জন্ম দেয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্বপ্ন। মা তাঁকে একা হাতে বড় করেন, পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। আর ইয়াশিকা শিক্ষকতা করে সংসারকেও সাহায্য করতে শুরু করেন। ছোট বোন যোগ দেন বিমান বাহিনীতে, বড় বোন নৌবাহিনীর ডাক্তার, আর ইয়াশিকা, তিনিও পিছিয়ে থাকেননি।
১৯৯২ সালে সেনাবাহিনীতে নারী নিয়োগ শুরু হলে, ইয়াশিকা সিলেকশন বোর্ড পরীক্ষায় পাশ করেন এবং ১৯৯৪ সালে চেন্নাইয়ের অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমিতে যোগ দেন। ১৯৯৫ সালে একটি সেনা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। তাঁর শ্বশুরবাড়িও সেনা পরিবার। ১৯৯৬ সালে প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম হয় ইয়াশিকার। এরপর ১৯৯৭ সালে তিনি লেহ-এর উচ্চভূমিতে প্রথম মহিলা লজিস্টিক অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন।
১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধ। তখন ইয়াশিকার দ্বিতীয় সন্তানকে গর্ভে। ডাক আসে যুদ্ধের। সেই ডাক তিনি উপেক্ষা না করে যোগ দিয়েছেন দেশরক্ষার কাজে। নিজের সাক্ষাৎকারে ইয়াশিকা বলেন, “আমি গর্ভবতী ছিলাম, এটা ঠিক। কিন্তু আমি একজন সেনা অফিসার। এবং আমার ডিউটি ছিল দেশকে সেবা দেওয়া।” এই মনোভাবই তাঁকে করে তোলে একজন প্রকৃত ‘ওয়ার হিরো’। গর্ভাবস্থার শারীরিক কষ্ট, পাহাড়ি অঞ্চলের প্রতিকূলতা, যুদ্ধের আতঙ্ক সবকিছুকে দূরে সরিয়ে তিনি অবিচল থাকেন নিজের কর্তব্যে।
বর্তমানে ৫১ বছর বয়সী ক্যাপ্টেন ইয়াশিকা ত্যাগী ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন। তবে থেমে থাকেনি তাঁর সফর। তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এখন একজন খ্যাতনামা অনুপ্রেরণামূলক বক্তা হিসেবে যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করছেন। ক্যাপ্টেন ইয়াশিকা হাতওয়াল ত্যাগীর জীবন কেবলমাত্র একজন সেনা অফিসারের কাহিনি নয়। এটা এক নারীর, এক মায়ের, এক দেশপ্রেমিকের বীরগাথা! সীমান্তে লড়েছেন, আবার মাতৃত্বকেও সন্মানিত করেছেন তিনি। দেশের নাগরিকদের চোখে, তিনিই সেই নির্ভীক রানি যিনি গর্ভে সন্তান ধারণ করেও দেশ মাতৃকার সেবায় ছিলেন অবিচল।
