অভিজিৎ বসু
দেশ প্রেমের কোনও বিকল্প নেই” এটা বেশ ভালো ব্যাপার কিন্তু। সারা দেশ জুড়ে এখন দেশের জন্য প্রেম ভালবাসা আর দেশকে ঘিরে দুর্নিবার ভালোবাসা উপচে উপচে পড়ছে চারিদিক থেকেই। প্রাইভেট চ্যানেল থেকে দূরদর্শন সব এখন অভিষেকময় হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। দেশপ্রেমকে সামনে রেখে কদম কদম বাড়ায়ে যা। পুলওয়ামা থেকে হালে মোদির, ট্রাম্প বিড়ম্বনা সব ভেসে গেল , সৌজন্যে শশী-অভিষেক। আসলে এই যে দেশকে সামনে রেখে ডান, বাম, দক্ষিণপন্থী সব দলের সবার এগিয়ে চলা এটা কিন্তু বেশ ভালই ব্যপার কিন্তু। একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শাসক আর বিরোধী দলের নেতাদের। হাসিমুখে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ানো দেশের বাইরে সম্প্রীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া। যে বার্তা হাসিমুখেই প্রচার করা সবার সাথে। অপারেশন সিঁদুর উত্তরপর্বে ভারতের দেশপ্রেমের যে জোয়ার বহমান, তার জীয়ন কাঠি আদতে কিন্তু পাক বিদ্বেষ। যা শুধু ঘৃণার জন্ম দেয় আমাদের। যাঁর যত বেশি ঘৃণা তাঁর ততবেশি দেশপ্রেম উথলে উঠছে যেনো এখন এটাই একমাত্র ট্রেন্ড হয়ে গেছে দেশের সর্বত্রই।
আজকাল যাকে রাষ্ট্রবাদ বলার চল হয়েছে এই বাংলাতেও। আরও স্পষ্ট করে বলতে হবে এটাই হিন্দু রাষ্ট্রবাদ। তার প্রাবল্যে দেখা যাচ্ছে ভেসে গিয়েছে সব্বাই। জনবিচ্ছিন্ন বামপন্থীরা ছাড়া সবাই, এখন যুক্তি তর্ক শিকেয় তুলে দেশপ্রেমের শরিক আমরা সবাই প্রায়। দেশপ্রেমের জমি বিজেপির হাতে ছেড়ে দেওয়া যাবে না কোনো মতেই। আর তাই ঘরে ফেরা পূর্ণম কুমার সাউ এর পরিবার এর পাশে দাঁড়াতে গিয়ে তৃণমূলের ব্রিগেড এর একদম সেই বীর সেনার পরিবারকে সব দিক থেকে বেঁধে রাখা, ধরে রাখা আটকে রাখা আর যেনো সে কোনো ভাবেই হাতছাড়া যেনো না হয় সে দিকে নজর রাখা। কোনো ভাবেই যাতে হাতছাড়া না হয় দেশপ্রেমের এই বীর সেনা তাঁদের কাছ থেকে। তারজন্য সাজ সাজ আয়োজন গোটা এলাকা জুড়ে। আসলে দেশপ্রেমের যে সত্যিই কোনও বিকল্প নেই এই ভূভারতে। সেটা আর যাই হোক বিজেপির মতো তৃণমূল কংগ্রেসও বুঝে গেছে যে এতদিনে। আর তাই দেশপ্রেমের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে দলের ওপরতলা থেকে নিচু তলার মা মাটি মানুষের দলের নেতা মন্ত্রী সবাই।
দেশপ্রেমের সত্যি কোনো বিকল্প নেই কিন্তু একদম।
বিরোধী দলগুলি এখন সেই দেশপ্রেমের মিস্টি মধুর নেশায় বুঁদ হয়ে আছেন। আর একমাত্র বিজেপি, তার রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরনের লক্ষ্যে অবিচল হয়ে কাজ করে চলেছে ধীরে ধীরে। আপাতত সফলও বটে তাঁরা কিছুটা। এক্ষেত্রে বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার অপ্রতিরোধ্য। বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা দেখলাম, অপারেশন সিঁদুরের পর সংঘর্ষ বিরতি ঘোষণা নিয়ে কেন্দ্রের শাসককে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই বিড়ম্বনায় ফেলুন না কেন, সব আপাতত মুলতুবি। বিজেপি তার বক্তব্য বিরোধীদের মুখ দিয়ে বলিয়ে ছাড়ছে তাঁদের নিজেদের কথা।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাজনীতিতে ঝানু কংগ্রেসের শশী থারুর থেকে তৃণমূলের তরুণ তুর্কি নেতা দলের অন্যতম মুখ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে মিডিয়ায় যা বলে চলেছেন, তাই তো বিজেপির কথা। বাধ্য ছাত্রের মতো, টিভি ক্যামেরার সামনে বিরোধী সদস্যরা শাসকের বয়ান উগরে দিচ্ছেন নিজেদের মুখ থেকে। অন্যান্য বেসরকারি মিডিয়া তো বটেই, নজিরবিহীন ভাবে দুরর্দশন তার বাংলা সমেত যাবতীয় ভাষায় প্রাইম টাইমে গুরুত্বের নিরিখে গুজরাটে মোদির রোড শোর পরেই সম্প্রচারিত হয়েছে অভিষেকের পাকিস্তানকে তুলোধোনা করা ভাষণ।
কোথায় পুলওয়ামা কোথায় পহেলগামকাণ্ডের গোয়েন্দা ব্যর্থতা , আর কোথায় মার্কিনী মধ্যস্ত বিতর্ক। সব লঘু হয়ে গিয়েছে এই দেশপ্রেমের ভরা বসন্তে।
এরপর সংসদের বিশেষ অধিবেশনের ডাকা না ডাকা অর্থহীন। বিরোধীরা কিন্তু একদিকে যেমন সঙ্ঘ কথিত রাষ্ট্রবাদের শিকার তেমনই ভোটের কথা মাথায় রেখে বৃহত্তর হিন্দু সমাজকে তোয়াজ করতে ব্যস্ত সবাই। অন্যদিকে নিজেরা পরস্পরের জল মেপে চলেছে নিরন্তর। বিশ্বের দেশে দেশে সর্বদলীয় প্রতিনিধি পাঠানোর এমন এলাহী আয়োজন করলেন মোদি, যে তা নিয়েই সবাই মেতে উঠলেন। সংসদে বা প্রত্যক্ষ ভোটের ময়দানে যে তৃণমূল পদে পদে বিজেপি কে বেগ দেয়, সেই দলের সেকেন্ড ইন কমান্ডকেই বেছে বেছে প্রচারে সামনে এনে দেওয়া হয়েছে যাতে একেবারেই মাস্টারস্ট্রোক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশের প্রতিনিধি এখন অভিষেক বন্দোপাধ্যায়।
যিনি অপারেশন সিঁদুরের পর পাক অধিকৃত কাশ্মীর দখলের ডাক দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, সোমবার টিভি ক্যামেরার সামনে তাঁর বয়ানবাজিতে বোঝার উপায় নেই অভিষেক শাসক না বিরোধী কোন দলের হয়ে ব্যাট করছেন তিনি। সত্যিই দেশপ্রেমের কি সুন্দর মহিমা। এ যেন ডায়মন্ডহারবারের সংসদ নন, ভিন্ন এক অভিষেক বন্দোপাধ্যায়। যাঁর মুখে এখন দেশের কথা। বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জয় গাথার কথা। এর থেকে ভালো উপায় আর কি হতে পারে। বিরোধীদের কাছে টেনে এনে তাদের দিয়েই নিজেদের কাজের গুণগান করানো। যে কৌশল অবলম্বন করে সংঘ পরিবার ও বিজেপি এখন দেশপ্রেমের জোয়ারে ভাসিয়ে দিয়েছে বিরোধী দলের নেতানেত্রীদের। এর থেকে ভালো উপায় আর কী হতে পারে। জয় দেশের জয়। জয় দেশ মাতৃকার জয়। জয় দেশপ্রেমের জয়।
