সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
দেশের সংবিধানকে অবমাননা করে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে চুরমার করছেন খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এই অভিযোগ তুলে আজ প্রধানমন্ত্রীকে তুলোধোনা করলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে সম্প্রতি নীতি আয়োগ এর বৈঠকে কেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি যোগ দেননি তারও ব্যাখ্যা দিলেন মমতা। স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাস বিজড়িত যোজনা কমিশন এবং তার নীতি-আদর্শকে ধ্বংস করেছে নরেন্দ্র মোদি সরকার। প্রকারান্তরে এই অভিযোগ তুলে মমতার বক্তব্য, নেতাজী সুভাষ চন্দ্রের দেওয়া যোজনা কমিশনের নাম বদল করে নেতাজি সুভাষের ইতিহাস কে গুলিয়ে দিতে চাইছে মোদি সরকার। নেতাজি সুভাষের যোজনা কমিশনের বদলে নীতি আয়োগ নাম দিয়ে যা তৈরি হয়েছে সেখানে নীতিই বা কি? আয়োগ কি? তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। যেখানে নেতাজি সম্মান নেই যেখানে রাজ্যের সম্মান নেই যেখানে কেন্দ্র রাজ্য যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোট সম্মান নেই। সেই সভায় কেন যাব? পাল্টা জানিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। গতবার নীতি আয়োগ এর বৈঠকে দিল্লিতে যোগ দিয়েছিলেন মমতা। কিন্তু নিজের বক্তব্য মাঝপথে থামিয়েই তাকে কলকাতায় ফিরতে হয়। সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরে বাংলার মুখ্যমন্ত্রী এদিন নবান্নে জানান, ” আগেরবার আমাকে বলতে দিয়ে মাইক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এটা শুধু আমার অসম্মান নয়, এটা রাজ্যকে অপমান করা হয়েছে। অন্য কোন মুখ্যমন্ত্রী বলার সময় তো এরকম করা হয়নি! যখন বলতেই দেবেন না তখন যাব কেন? আমি লাঞ্চ খেতে যাই না। আমি আমার কথা বলতে যাই। যখন কথাই বলতে পারব না তাহলে যাব কেন? শুধু আমি নই যতদূর জানি কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রীও এই বৈঠকে যাননি। কই সে ব্যাপারে কোন কথা হচ্ছে না কেন?” পাল্টা উত্তর চান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার সাফ কথা ” প্রধানমন্ত্রী হয়ে আপনি একজনকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দিয়ে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ান। আর যাকে দায়িত্ব দিয়ে যান তিনি যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছেন। সেই বেলায় প্রধানমন্ত্রী হয়ে আপনি কখনো মুখ খুলেছেন?”
যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে গুরুত্ব না দিয়ে রাজ্যের অধিকারে মোদি সরকার যে বারবার হস্তক্ষেপ করেছেন এবং রাজ্যকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন সে ব্যাপারেও এরিন ফের সরম হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উদাহরণ হিসেবে বাংলার বাড়ি প্রকল্প, ১০০ দিনের কাজ, গ্রামীণ রাস্তা ইত্যাদির কথা তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। বাংলার বাড়ি থেকে ১০০ দিনের কাজ প্রকল্পে কেন্দ্র টাকা দেয়নি এই অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন তা সত্ত্বেও রাজ্যের মানুষের স্বার্থে রাজ্য নিজের উদ্যোগে এই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ করছে। রাজ্যে নিজস্ব তহবিল থেকে টাকা দিয়ে গ্রামীণ রাস্তার প্রকল্প করা হয়েছে। রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প রয়েছে। সেখানে ৫ লক্ষ টাকা করে স্বাস্থ্য বীমা মেলে। কেন্দ্র আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প কেন হয়নি তা নিয়ে বারবার রাজনীতি সুর চড়া করেছে। মমতা বলেন, ” আয়ুষ্মান ভারতে রাজ্যকে ৪০ শতাংশ টাকা দিতে হয়। রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্য সাথী প্রকল্প থাকা সত্ত্বেও কেন এই অতিরিক্ত খরচের দায়ভার নেবে রাজ্য?” মমতার দাবি, সমস্ত কর বা রাজস্বের টাকা রাজ্য থেকে কেন্দ্র নিয়ে যায় কিন্তু রাজ্যকে তার প্রাপ্য টাকা দেওয়া হয় না। কয়লা গরু পাচারের নামে রাজ্যকে দোষারোপ করা হয় অথচ এসব কিছুই দেখভালের দায়িত্বে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক। রাজ্যের সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বারোশো একর জমি কেন্দ্রকে তুলে দেওয়া হয়েছে। বাগডোগরা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণের জন্য কেন্দ্র যখনি জমি চেয়েছে সেই জমি রাজ্য সরকার কেন্দ্রকে দিয়েছে। অথচ ডানকুনি ফ্রেইট করিডর যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রেলমন্ত্রী থাকাকালীন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেটা পিপিপি মডেল এ তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদি সরকার। অথচ বাকি সব রাজ্যের প্রকল্পগুলি সরকারি উদ্যোগে তৈরি করা হচ্ছে। বাংলার সঙ্গে এই ধরনের বৈরিতা কেন? কেন যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামো রাজ্যের অধিকার থেকে বাংলা বারবার বঞ্চিত হচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট জবাব ” প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিজি বাংলা আপনার কাছে এক লক্ষ ৭৫ হাজার কোটি টাকা পায়। সেই প্রাপ্য টাকা আগে চায় বাংলা।”
শুধু প্রশাসনিক বা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিষয় নয় খেলাধুলা বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও মোদি সরকার কিভাবে রাজ্যের অধিকার কে খর্ব করছে তা নিয়েও সরব হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সম্প্রতি আইপিএল ফাইনাল ও প্লে অফের একটি ম্যাচ ইডেন থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আহমেদাবাদে নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে। বৃহস্পতিবার নবান্ন থেকে তা নিয়েও খুব প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতার বক্তব্য, ” একটা মোদি স্টেডিয়াম তৈরি করে সব খেলা সেখানে নিয়ে চলে যাওয়া হচ্ছে। কর্ণাটক, কেরালা, বাংলা, ওড়িশায় স্টেডিয়াম নেই ? তাহলে সব খেলা কেন গুজরাটে হবে?” প্রশ্ন তুলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে মমতার স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, ” মোদিজি আমার মুখ খোলানোর চেষ্টা করবেন না। ভাবেন কি খেলাধুলা নিয়ে আমি কোন খবর রাখি না। আমি যদি মুখ খুলি তাহলে আপনার মুখোশ খুলে পড়ে যাবে। বিদেশে প্রতিনিধি পাঠিয়ে যে ইমেজ তৈরি করার চেষ্টা করছেন সেসব খুলে যাবে।”
