সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
একদিকে যখন সর্বদলীয় প্রতিনিধি দল অপারেশন সিঁদুরের সাফল্য এবং বিশ্বের দরবারে পাকিস্তানের সন্ত্রাসের বিরোধিতায় সোচ্চার হয়েছে ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গে এসে অপারে শন সিঁদুরকে নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক হাতিয়ার করতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সরকারি মঞ্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকারকে পঞ্চবাণে বৃদ্ধ করা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাল্টা আক্রমণ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বলা ভালো নজির বিহীন ভাবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করলেন। মুখ্যমন্ত্রীর মতে ” সিঁদুর মহিলাদের আত্মসম্মান। আর সেই সিঁদুর নিয়ে রাজনীতি করতেই একতরফা ভাবে কেন্দ্র এই অপারেশন সিঁদুর নামকরণ করেছে। যে দলের নেতারা মহিলাদের সম্মান দেয় না তাদের দলের নেতা নরেন্দ্র মোদি। সব দলের প্রতিনিধিরা যখন গোটা বিশ্বে দেশ রক্ষার লড়াই নিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন তখন রাজ্যে এসে সেই লড়াইকে সামনে রেখে রাজনীতি করছেন প্রধানমন্ত্রী। এটা খুবই দুঃখজনক। প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে তার কেন্দ্রিয় মন্ত্রী বলছেন এ রাজ্যেও এরকম অপারেশন করতে হবে। আমি চ্যালেঞ্জ করছি। এখনই নির্বাচন হোক, ফলাফল দেখা যাবে।”
অপারেশন সিঁদুরের পর প্রথমবার রাজ্যে এসে আলিপুরদুয়ারের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাজ্য সরকারকে মূলত পাঁচটি বিষয় নিয়ে তোপ দাগেন। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নারী সুরক্ষা দুর্নীতি বেকারি তথা যুব সমাজের হতাশা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক স্বার্থপরতা এই পাঁচটি বিষয়ে রাজ্য সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেন নরেন্দ্র মোদি। পাল্টা নরেন্দ্র মোদিকে তীব্র আক্রমণ করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নরেন্দ্র মোদি “ধ্বংসের প্রতীক” নরেন্দ্র মোদী “মিথ্যাচারী ব্যবসাদার” বলে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী প্রশ্ন তোলেন ” আমেরিকা কিছু বললে যিনি এক সেকেন্ডে চুপ করে যান তিনি দেশের রক্ষা করবেন? দেশরক্ষার সম্মান তিনি কিভাবে জানাবেন? মোদী না সাচ্চা হ্যায় না আচ্ছা হ্যায়।” যে রাজ্য সরকার অপারেশন সিঁদুর থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশ রক্ষার লড়াইতে কেন্দ্রকে পূর্ণ সমর্থন করেছে সেই রাজ্যে এসে দেশ রক্ষার লড়াই নিয়ে নরেন্দ্র মোদির এই রাজনীতিকরণের তীব্র প্রতিবাদ জানান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার মতে, ” দেশ রক্ষার লড়াইকে মোদীজি ধাক্কা দিয়েছেন। এর ফল ভালো হবে না।”
মূলত যে পাঁচটি ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারকে তুলোধোনা করেছেন তার মধ্যে একটি হলো “নির্মম সরকার”। মালদা মুর্শিদাবাদের যে দাঙ্গা সন্ত্রাস পরিস্থিতি হয়েছে তার প্রেক্ষিতেই প্রধানমন্ত্রী রাজ্য সরকারকে “নির্মম” বলে উল্লেখ করেছেন। পাল্টা মমতার বক্তব্য, ” দাঙ্গা লাগানোর ওস্তাদ বিজেপি। মালদা ও মুর্শিদাবাদের ঘটনা বিজেপি করেছে আমরা প্রমাণ দেব। মুদি সরকারের নীতি হলো বিভাজনের নীতি একসময় তিনি বলতেন চা-ওয়ালা, পরে বললেন পাহারাদার। এবার তিনি সিঁদুর বেচতে এসেছেন” পাল্টা কটাক্ষ মমতার। বাংলার সঙ্গে জঙ্গিদের নাম মিশিয়ে মিথ্যাচার করছেন নরেন্দ্র মোদি। একথা উল্লেখ করে মমতার পাল্টা হুঁশিয়ারি ” আপনি যদি এতই সাচ্চা হন তাহলে পাহালগামে যে জঙ্গিরা নিরীহ মানুষদের মারল তাদেরকে ধরছেন না কেন? এখনই নির্বাচন করুন। বুঝিয়ে দেব কে ঠিক।” রাজ্যে দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী যেভাবে রাজ্য সরকারকে কাঠগড়ায় তুলেছেন তার পাল্টা হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য ” দুর্নীতিতে সেরা নরেন্দ্র মোদী নিজে। সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি মোদি সরকারের আমলে। মধ্যপ্রদেশের ব্যাপন কেলেঙ্কারি, উত্তরপ্রদেশে শিক্ষকদের চাকরি বাতিল এসব ব্যাপারে কি পদক্ষেপ করেছে মোদি সরকার? উত্তরপ্রদেশে প্রকাশ্য রাস্তায় ব্লু ফিল্ম চলছে! এ ব্যাপারে কি পদক্ষেপ করেছে মোদি সরকার? আমাদের রাজ্যে শিক্ষকদের চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আমরা মানবিক পদক্ষেপ করেছি। শিক্ষকরা যে চাকরি হারিয়েছেন তা রাজ্য সরকারের জন্য নয়। আদালতের জন্য। আর পর্দার আড়ালে নায়ক কে? ঠাকুর ঘরে কে? আমি তো কলা খাইনি!” পরোক্ষের সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ইঙ্গিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আইন-শৃঙ্খলা প্রশ্নে মুখ্যমন্ত্রীর সাফ জবাব, বাংলার আইন-শৃঙ্খলা যদি এতই খারাপ হয় তাহলে মণিপুরের অবস্থা কি? কেন প্রধানমন্ত্রী মণিপুরে যাননি? এন আর সি নাম করে আসামে গুলি চালানো হয়েছে। মুর্শিদাবাদ মালদা থেকে সন্দেশখালি সবকিছুতেই পূর্বপরিকল্পনা করে কাজ করেছে বিজেপি। আর নির্বাচনের ঠিক আগে এসে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র করেন নরেন্দ্র মোদি বলে মন্তব্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। নারী সুরক্ষা এবং সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনার পাল্টা কটাক্ষ করেছেন মমতা। ” নারী সুরক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধে রাজ্য সরকার ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দেয়। বিজেপি শাসিত রাজ্যে কি হয়? সামাজিক সুরক্ষায় বাংলায় সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। আপনাদের রাজ্যগুলোর কি চেহারা? আমি চ্যালেঞ্জ করছি আমার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শো তে বসুন। সবকিছু সাফ জবাব হবে” পাল্টা বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর। দেশের সেনাবাহিনীর এই লড়াইকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে রাজনীতি করার অভিযোগ তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চ্যালেঞ্জের সুরে স্পষ্ট জানিয়ে দেন ” নির্বাচনের আগে প্রতিবার এসে রাজ্যে রাজনৈতিক চক্রান্ত করে ও রাজ্যকে বদনাম করে নরেন্দ্র মোদির যত চেষ্টাই করুন বাংলা কখনো বিজেপির হাতে যাবে না। রবীন্দ্রনাথ নজরুলের বাংলা বিজেপিকে চায় না। পারলে এখনই নির্বাচন করুন আমি চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি।”
