বাংলার রাজনীতিতে ফের একবার সংবাদ শিরোনামে অনুব্রত মণ্ডল। আইসিকে কদর্য ভাষায় হুমকি দিয়ে বিতর্কে এক সময়ের বীরভূমের ‘বাদশা’। ক্ষমা চেয়েও মিলছে না রেহাই। চলছে পুলিশে টানাটানি। দলের মধ্যেও বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে প্রবল চাপ তৈরি হয়েছে। চাপ এতটাই যে, তড়িঘড়ি ভুল বাংলায় চিঠি লিখে ক্ষমা চাইতে হয়েছে। আর যত এ সব হয়েছে, কেষ্টর বাজখাই গলা তত মিহি হতে হতে এক সময় হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। জেল থেকে বেরনো ইস্তক সবচেয়ে বড় ঘা তিনি খেয়েই গেলেন। আর এখানে প্রশ্ন উঠছে, ক্যামেরার সামনে পুষ্পাকে নকল করে ‘ঝুকেগা নেহি’ বলা লোকটা বিপাকে পড়ে রাতারাতি ভিজে বেড়াল হয়ে গেল? আসলে, বুঝলেও মানতে চাইছিল না মন। জেল থেকে ফিরে ঝানু নেতা অনুব্রত নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, হাওয়া কতটা বদলে গেছে এই ক’দিনে। কিন্তু তিনি যে আর বীরভূমে তৃণমূলের শেষ কথা নন, সেটা সিল-ছপ্পর দিয়ে গত ক’দিনে তাঁকে বুঝিয়ে দেওয়া হল। বীরভূমে কেষ্ট-রাজের আপাত ইতি।
কলকাতা থেকে আর এক বিদায়ের বাজনা চড়াম চড়াম সুরে বাজছে। যার বাজছে, এক সময় তাঁকে ঠাট্টা করে বিজেপির কেষ্ট মণ্ডল বলতেন অনেকে। নির্বাচনী সাফল্যের নিরিখে বঙ্গ বিজেপির সবচেয়ে সফল রাজ্য সভাপতি, দিলীপ ঘোষ। মুখের লাগাম হারিয়ে ফেলা অকুতোভয় দিলীপকে সমঝে চলে সব দলই। কিন্তু গত কয়েক মাসে তাঁর জীবনে এসেছেও বড় বদল! নেতা থেকে এখন তিনি স্রেফ কর্মী। দলে এতটাই কোনঠাসা যে, বাংলায় মোদীর সভাতেও ডাক পান না। কলকাতায় অমিত শাহের সভাতেও দেখা যায় না প্রাক্তন সাংসদকে। আসলে, অনুব্রতর মতোই দ’য়ে পড়েছেন একদা বঙ্গ বিজেপির মুখ দিলীপ। ঘটনাচক্রে, অনুব্রতর মতোই দিলীপও বুক চিতিয়ে রাজনীতি করেছেন মাঠে-ময়দানে। দু’জনেই মুখ খুললে খবর! এও এক সমাপতন, বঙ্গ রাজনীতির দুই বাঘই আজ পড়েছেন কাদায়।
কাজল প্রভাবে চাপে অনুব্রত?
প্রায় প্রবাদ হয়ে যাচ্ছিল, বীরভূমের ‘ছোট মুখ্যমন্ত্রী’ নাকি তিনিই। তাঁর কথাতেই ‘বাঘে গরুতে একঘাটে জল’ খেত। এমন কী তাই পুলিশকে ঘড়ি দেখিয়ে সময় বেঁধে দেওয়া থেকে শুরু করে পুলিশকে ‘বোমা মারার’ হুমকি দিয়েও রেহাই পেয়ে গিয়েছিলেন অনুব্রত মণ্ডল। এতটাই প্রভাব ছিল যে খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাল সংগঠন হলে মাফ করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন! জেলে থাকার সময়ও মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে ‘বীরের সন্মান’ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। যদিও গত কয়েক মাসে অনুব্রতের রাজনীতির ছবিটা বদলে দিয়েছে। গরু পাচার মামলায় দীর্ঘ সময় জেলে কাটাতে হয়েছে। আর সেই সময় বীরভূমের রাজনীতিতেও বড় বদল এসেছে। অনুব্রত বিরোধী গোষ্ঠী কাজল শেখের উত্থান ঘটেছে। ভোটেও বীরভূম নজরকাড়া সাফল্য এনে দিয়েছে তৃণমূলকে। সব কিছু হয়েছে অনুব্রতহীন বীরভূমে। তার প্রভাব এ বার মাটিতে পড়তে শুরু করেছে। সম্প্রতি অনুব্রত মণ্ডলের জেলা সভাপতি পদও কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাতেই চাপ বেড়েছে দোর্দণ্ডপ্রতাপ শাসক নেতার। ক’দিনের ঘটনাক্রম তাঁকে বুঝতে বাধ্য করেছে, বীরভূমের রাশ আর তাঁর একার হাতে নেই। দল এ বার আর রেয়াত করার মুডে নেই বুঝেই শুক্রবার নির্ধারিত চার ঘণ্টার অনেক আগে কার্যত ‘মাথা নত’ করে ফেলেছেন সেই ‘বাঘ’। ভুল বাংলায় তড়িঘড়ি ক্ষমা চেয়েছেন।
ভাইরাল অডিয়ো কাণ্ডে শনিবার অনুব্রতকে তলব করেছিল বীরভূম জেলা পুলিশ। যদিও অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে হাজিরা দেননি। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কেষ্টকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই আবার হাজিরা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
দিঘার মন্দির যাওয়াই কাল হল?
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে দিলীপকে ঘিরে রয়েছে একাধিক বিতর্ক। কিন্তু কোনও দিন দমেননি তিনি। কখনও প্রকাশ্যে লাঠি হাতে খেলা দেখিয়েছেন তো, আবার কখনও শাসক দলের হুমকির মুখে তেড়ে গিয়েছেন। আর সেই দিলীপই ‘ব্রাত্য’ বঙ্গ বিজেপিতে? সম্প্রতি আলিপুরদুয়ারে সভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে ডাক পাননি। অমিত শাহের সভাতেও ডাক পাননি।
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন, সম্প্রতি স্ত্রীকে নিয়ে দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরে গিয়েছিলেন দিলীপ। মমতার সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাঁকে। যা মোটেই ভাল চোখে দেখেনি বিজেপি। তারপর সম্প্রতি সাক্ষাৎকারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বদলের যে অভিযোগ উঠছে তা গোটা বিষয়ে অনুঘটকের কাজ করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। বিজেপির দিল্লির নেতৃত্ব আপাতত দিলীপ নিয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতিতে চলবেন বলে ঠিক হয়েছে। আর সেটাই আমন্ত্রণ না পাওয়ার কারণ। পাল্টা দিলীপও জল মাপছেন। যদিও দিলীপের সেই মেজাজ বড্ড অচেনা ঠেকছে অনুগামীদের কাছে। ঠিক যেমন বদলে যাওয়া কেষ্টকে দেখে যেন চেনা যায় না, বলছেন দাদার অনুগামীরা।
