উত্তরে আরও আবছা হল জাতীয় কংগ্রেসের সাইনবোর্ড। হাত ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিলেন ৭০ বছর বয়সি শিলিগুড়ির নেতা শঙ্কর মালাকার। এক দশক ধরে শঙ্কর ছিলেন শিলিগুড়ির অদূরে মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির বিধায়ক। ২০২১-এর বিধানসভা ভোটে হেরে যান। ’২৬-এর ভোটের আগে সেই শঙ্কর যোগ দিলেন তৃণমূলে।
পরিবর্তনের পর থেকে দলবদল বিষয়টা জলভাত হয়ে গিয়েছে। বাম যত ছোট হয়েছে, আয়া রামদের দাপট তত বেড়েছে। কিন্তু আর পাঁচটা দলবদলের মতো শঙ্করের তৃণমূলে যোগদানকে এক করে দেখা যাবে না। কারণ, যোগদানের বিষয়টি হচ্ছে এমন একটা সময়ে যখন কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী সোজা ফোন করছেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের সর্বদলীয় সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সফররত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। দু’জনের কথা হচ্ছে নানা বিষয়ে। হাতেনাতে ফল, ‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে আলোচনা করার জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশনের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীকে পাঠানো চিঠিতে রাহুল-অভিষেক পাশাপাশি সই। কাছাকাছি সময়ে তৃণমূল ভবনে হাত ছেড়ে মমতার পতাকা হাতে নিচ্ছেন উত্তরবঙ্গে কংগ্রেসের শেষ নেতাদের অন্যতম শঙ্কর। সব দেখেশুনে জলপাইগুড়ির এক বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতার আক্ষেপ, “আর কী বাকি থাকল? সাইনবোর্ডটাও তৃণমূল বেচে দিল।” রাজনীতি বড় জটিল খেলা, তবে এই সেটে জেলা কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে রাহুলের কাছে জাতীয় স্বার্থই যে দাম পাবে, বাংলার কংগ্রেসি রাজনীতির নাতিদীর্ঘ ইতিহাস আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। তৃণমূলের লাভের লাভ যেটা হল, শঙ্করের দলবদল নিয়ে প্রদেশ কংগ্রেস ছাড়া চেঁচানোর কেউ থাকল না।
এ বার আসি ‘মোস্ট ইম্পরট্যান্ট’ কথায়। শঙ্করকে দলে নিয়ে তৃণমূলের কী লাভ হল? ২০২১ সালে শঙ্কর সংরক্ষিত মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে পেয়েছিলেন মেরেকেটে ২৪ হাজার ভোট। মোট ভোটের মাত্র ৯.৫৯ শতাংশ। লড়াই ছিল মূলত দ্বিমুখী। বিজেপি বনাম তৃণমূল। সেখানে বিজেপির আনন্দময় বর্মন পান ৫৮.১১ শতাংশ ভোট। বহু পিছিয়ে দু’নম্বরে তৃণমূল প্রার্থী পান ২৮.৬৬ শতাংশ ভোট।
ভোটার তালিকার হিসেব বলছে, ওই কেন্দ্রে বর্মন পদবীর মানুষের সংখ্যা যা তার চেয়েও বেশি তাদের সামাজিক প্রভাব। তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত এই কেন্দ্রে অর্থনৈতিক ভাবে এগিয়ে থাকা রায়, দাস, ঘোষ, সরকার, ছেত্রী, শর্মা, সিংহ, থাপা পদবীধারীরা ওই কেন্দ্রের মূল ভোটের সবচেয়ে বড় অংশীদার এবং ‘ইনফ্লুয়েন্সার’। এই ভোট সংগঠন মুখাপেক্ষী নয়। তাই এই ভোটের সিংহভাগ কার দখলে যাবে, তা নিয়ে এত আকচাআকচি। সেখানে শঙ্করের প্রভাব কতটা? শঙ্করকে কেন নিল তৃণমূল? ভোটের অঙ্ক বলছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত হওয়া ছ’টি বড় ভোটের মধ্যে বিজেপি লিড করছে ৩টি ভোটে, কংগ্রেস এগিয়ে ছিল ২টি ভোটে এবং সিপিএম এগিয়ে ছিল ১টি ভোটে। তৃণমূল কোনও লড়াইতেই নেই। এই হিসেব এ বার পাল্টানোর পরিকল্পনা সাজাচ্ছে তৃণমূল। তারই প্রথম পদক্ষেপ, শঙ্করকে দলে টানা।
বঙ্গ কংগ্রেসি সংস্কৃতিতে শিলিগুড়ির শঙ্কর এখন সেই হাতেগোনা সাদা পাজামা-কুর্তার কংগ্রেস নেতা। এখনও শিলিগুড়ি শহরে প্রভাব। রঙিন শঙ্করকে উত্তরবঙ্গ চেনে তাঁর কংগ্রেসি সত্ত্বার কারণেই। শহরের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের সঙ্গে শঙ্করের সখ্য, আজ নয় বহু পুরনো। একই সঙ্গে মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি কেন্দ্রের ১০ বছরের এমএলএ। অর্থাৎ, তৃণমূলের ক্ষতি তো নেই, বরং ঠিক মতো কাজে লাগাতে পারলে দুটো পয়সা ঘরে এলেও আসতে পারে। কিন্তু কথায় আছে, অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট। তৃণমূলকে খেয়াল রাখতে হবে। আসন্ন বিধানসভায় শিলিগুড়ির পাশাপাশি ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি এবং মাটিগাড়া-নকশালবাড়ি আসনকে পাখির চোখ করেছে তৃণমূল। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হয়ে শঙ্কর পারবেন খেলা দেখাতে?
