সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
‘মানসিক চাপ’। খেলার দুনিয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। যারা খেলাধূলা করেছেন তারা সকলেই বলবেন যে সবসময় চাপ থাকে। ভক্ত, অভিভাবক, স্পনসর, পরিবার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নিজের কাছ থেকে। দিনের শেষে একজন ক্রীড়াবিদ একাকী তার নিজের মনের সাথে লড়াই করে। সমস্ত চিন্তাভাবনা যা ক্রমাগত আসে, ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করে এমন সম্ভাবনা এবং অবশেষে কী হতে পারে তার সমস্ত আশা এবং প্রত্যাশা। এই সবকিছু নিয়েই চলতে থাকে মানসিক দ্বন্দ্ব ও বিড়ম্বনা। আর সেই মানসিক চাপ কাটিয়ে
একটি দেশ বা জাতিকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে বাভুমা ব্রিগেড।
আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় খেলার দুনিয়ায় ম্যান্ডেলার দেশকে চিরতরে বদলে দিয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকানরা চাপের মুখে জিততে পারে না, এটাই ছিল স্বীকৃত বক্তব্য। দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে এই
‘ চোকার ‘ তকমা দূর করার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের। কেপলার ওয়েসেলস থেকে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে অথবা ডোনাল্ড-কারস্টেন-জন্টি রোডস-রা যে চাপের কাছে নতিস্বীকার করে বারবার লক্ষ্যপূরণ থেকে দূরে রয়ে গিয়েছিলেন সেখানেই বাজিমাত করে যাবতীয় চাপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসকে উত্তরণের পথ দেখালেন বাভূমা-মার্করাম-রাবাডা-রা।
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল তাদের জন্য খারাপ শুরু হয়েছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়ার কাছে প্রথম ইনিংসের লিড হস্তান্তর করা প্রোটিয়াদের কাছে প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু
অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই দক্ষিণ আফ্রিকানরা বিশ্বাস করতে শুরু করে। রাবাডা এবং এনগিদি শুরুতেই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন, কিন্তু তাও হয়তো যথেষ্ট ছিল না। অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের শেষ পর্বে যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির দিকে এগিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তবু হাল ছাড়তে নারাজ। একটু একটু করে মনের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করেন বাভূমা-রাবাডারা।
ভেতরের দানবদের কাটিয়ে ওঠা। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে নয় বরং নিজেদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করা। স্পষ্টভাবে বলতে গেলে প্রত্যাশা পূরণ করা। এই যাবতীয় চাপের সঙ্গে লড়াই ছিল বাভূমাদের।
লর্ডসে পরাজয় মানেই পুরনো ‘চোকার’ ট্যাগ আবার তাড়া করবে। এই মিথ ভেঙে ফেলে সমালোচকদের ভুল প্রমাণিত করতে মরিয়া ছিল বাভূমার দল। অবশেষে চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দেশবাসী তথা ভক্তদের নতুন জীবনরেখা এবং খেলাধূলার জগতে নতুন মনন তৈরি করে লড়াকু মানসিকতার নয়া ইতিহাস লেখার সুযোগ দিলেন বিশ্ব ক্রিকেটের ‘চোকার’-রা। আসলে খেলাধূলা এমনই। আর মানসিক চাপ যেকোনও খেলোয়াড়কে একটি নির্দিষ্ট দিনে সেরা অথবা সবচেয়ে খারাপ করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বাস করেছিল যে তারা এই মানসিক উত্তরণ করতে পারবে। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ানদের হারিয়ে এমন এক নতুন রূপকথা লিপিবদ্ধ করবে যা একটি প্রজন্মকে শুধু নয় একটি জাতির সমস্ত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্বজুড়ে খেলাধূলার ইতিহাসকে নতুনভাবে রচনা করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একাধিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। বাভূমা, মার্করাম এবং রাবাডার মতো তারকাদের এটাই প্রাপ্য ছিল। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিটি বর্ণের পুরুষের কাছে বাভূমার আকাঙ্ক্ষা থাকবে। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই যেভাবে বাভূমাকে বর্ণ বৈষম্যের কালো দাগ, ক্রিকেটার সুলভ শারীরিক গঠন না থাকা সর্বোপরি ক্রিকেট কেরিয়ার নিয়ে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয়েছিল তার যাবতীয় জবাব দেওয়ার জন্য গোটা বাভূমা ব্রিগেড যেন লর্ডসের এই টেস্ট ম্যাচ কে জীবনের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। তাই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় শুধু একটি প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া নয়, নিজের দেশ জাতি এবং বিশ্ব ক্রিকেটকে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া ঠিক এভাবেই বাইশ গজের যুদ্ধে নেমেছিল বাভূমা ব্রিগেড। “যদি ওরা পারে, তাহলে আমরাও পারব” গোটা বিশ্বে আজ থেকে স্বপ্নপূরণের এই নতুন সংকল্পের নজির সৃষ্টি হল। আর সেই কারণেই লর্ডসে বাভূমাদের এই জয় অন্য যেকোনও জয়ের তুলনায় অনন্য। সম্ভাবনা এবং সুযোগে ভরা একটি দিন। এমন একটি দিন যা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটকে বদলে দিয়েছে চিরকালের জন্য। ২০২৫- এর ক্রিকেটবিশ্ব যেন চোকারদের জন্যই। শুরু হয়েছে আইপিএল থেকে বিরাট কোহলিদের হাত ধরে। এবার সেই ব্যাটন এগিয়ে নিয়ে চলেছে বাভূমা-রা।
শুধু ক্রিকেটের মঞ্চই নয়, ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক স্তরে ফুটবলের মহারণ লক্ষ্য করলেও দেখা যাচ্ছে লক্ষ্য পূরণের মঞ্চে সফল হয়েছেন ‘ চোকার্স ‘ রাই।
উয়েফা ইউরোপা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে চলতি বছরেই সেরার শিরোপা পেয়েছে অন্যতম চোকার্স
টটেনহাম হটস্পার্স। ইউরোপের ফুটবল দুনিয়া যাদেরকে ‘SPURSY ‘ বলেই দীর্ঘদিন ধরে ডাকে যার অর্থ ‘ চোকার্স ‘ এর সমতুল। গত ১৭ বছর ধরে যাদের ভাগ্যে জোটেনি কোনও ট্রফি তারাই এবার ইউরোপা লিগ চ্যাম্পিয়ন। একইভাবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও এবার নয়া ইতিহাস। এবার ইউরোপ সেরার তকমা পেয়েছে প্যারিস সাঁ জারমা বা পিএসজি। একাধিকবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে উঠলেও এমনকি ২০২০ সালের ফাইনালে উঠে ট্রফি জয়ের খরা কাটেনি পিএসজির। ২০২৫-এ ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় করেছে লিওনেল মেসি, নেইমার, এমবাপে দের প্রাক্তন ক্লাব পিএসজি। তারকা খ্যাত হয়েও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি জয় অধরাই রয়ে গিয়েছিল পিএসজির। তথাকথিত তারকা হীন দল হয়ে এবার অধরা স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছে ফ্রান্সের বর্তমান সময়ের সেরা ক্লাব।দুদিন অগেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোরা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতে দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ করেছেন। সত্যিই, ২০২৫ যেন বিশ্ব ক্রীড়ায় পালাবদলের সন্ধিক্ষণ।
