মেঘনার ইলিশে প্লাস্টিক বিপদ
একটা সময় ছিল, বর্ষার প্রথম বৃষ্টি নামতেই বাংলার ঘরে ঘরে ইলিশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত। রূপালি সেই মাছের এক টুকরোই যেন ছিল বাঙালির সুখস্মৃতি, আত্মার আত্মীয়। কিন্তু আজ সেই রূপালি স্বপ্নে জমছে কালো ছায়া। প্লেটের ইলিশের পেছনে এখন লুকিয়ে রয়েছে প্লাস্টিকের মরণফাঁদ! স্বাদের মোহে আমরা যাকে তুলে নিচ্ছি, তার পেটে বাসা বেঁধেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, ভারী ধাতু আর বিষাক্ত রাসায়নিক কণা, যা শুধুই নদীর দূষণের নিদর্শন নয়, আমাদের ভবিষ্যতের বিপদেরও পূর্বাভাস!
মেঘনার মোহনায় ধরা ইলিশে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি। প্রশ্ন উঠছে, এই দূষণ কি শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও প্রভাব ফেলছে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। ২০১৯-২০২১ সালের মধ্যে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, নোয়াখালির বিভিন্ন মোহনা অঞ্চল থেকে ২০টি ইলিশ সংগ্রহ করে গবেষণা করা হয়। প্রতিটি মাছের অন্ত্রে পাওয়া গেছে গড়ে ১০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা। শুধু তাই নয়, ইলিশের শরীরে মিলেছে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিকের মতো ভারী ধাতুও।
গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল, কাপড়, প্রসাধনীর বর্জ্য থেকে এই মাইক্রোকণা এসে পড়ছে নদীতে, সেখান থেকেই মাছের শরীরে প্রবেশ। ছোট হলেও এই কণাগুলোর প্রভাব ভয়ানক। বিশেষত, বড় আকারের ইলিশে ভারী ধাতুর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি।
তবে গবেষক ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের আশ্বাস, ইলিশের অন্ত্রেই মূলত এসব কণা পাওয়া গেছে, যেটা আমরা খাই না। তবে শরীরের অন্য অংশে সেগুলোর প্রভাব কতটা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম জানান, প্লাস্টিকে থাকা ‘বিসফেনল এ’ জাতীয় উপাদান হরমোনে গোলযোগ, এমনকি ক্যানসারের কারণও হতে পারে। আগুনে রান্না করলেও সব ক্ষতিকর উপাদান নষ্ট হয় না।
ইলিশের স্বাদে ভরসা আছে, পুষ্টিগুণে গর্বও। কিন্তু পরিবেশ যদি এভাবে দূষিত হয়, তাহলে ‘জলের উজ্জ্বল শস্য’ও আর উজ্জ্বল থাকবে না বলেই মত গবেষকদের। এই গবেষণা তাই শুধু ইলিশ নয়, ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেতও বটে।
