সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
২০১২ সালের আইন অনুযায়ী ওবিসি তালিকা বাতিল করেছিল কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। ২০১০ বা তার আগের তালিকা যারা ওবিসি হিসেবে স্বীকৃত সেই সম্প্রদায়গুলিকে বৈধতা দিয়েছিল হাই কোর্ট। হাই কোর্টের এই নির্দেশের ফলে এক ধাক্কায় রাজ্যের ওবিসি সংরক্ষণ ১৭ শতাংশ থেকে নেমে ৭ শতাংশে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ ২০১২ ওবিসি তালিকা অনুযায়ী যে ১৪০টি সম্প্রদায়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল হাইকোর্টের নির্দেশে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ৬৬ তে। অর্থাৎ ১৭ শতাংশ থেকে সরাসরি পারদের পতন হয় ৭ শতাংশে। হাই কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী রাজ্য সরকারকে তিন মাসের মধ্যে নতুন করে যথাযথ নিয়ম মেনে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া বা আর্থিকভাবে দুর্বল শ্রেণীর সম্প্রদায়কে উপযুক্ত সমীক্ষার মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করে ১৭ শতাংশে পৌঁছতে হবে। আর ৭ থেকে ১৭-য় পৌঁছনোর সেই প্রক্রিয়ায় একাধিক গাফিলতির কারণে ফের রাজ্যে সরকারি চাকরির নিয়োগের ক্ষেত্রে তৈরি হল জটিলতা। নয়া ওবিসি তালিকার গেজেট নোটিফিকেশনের কার্যকারিতায় অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল হাইকোর্ট। রাজ্যের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ফের তৈরি হল ‘হ-য-ব-র-ল’ পরিস্থিতি।
মঙ্গলবার ওবিসি মামলায় বারবার রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেলকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় ডিভিশন বেঞ্চ। বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এজি কিশোর দত্তের কাছে জানতে চান কেন সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করে নতুন করে গেজেট নোটিফিকেশন করল রাজ্য? নতুন ভাবে সমীক্ষা করে যে গেজেট নোটিফিকেশন করা হবে সেকথা কি সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে রাজ্য? পাল্টা বিচারপতি তপব্রত চক্রবর্তী জানিয়ে দেন ” আদালতকে না জানিয়ে আদালত নির্দেশিত পদক্ষেপের বাইরে গিয়ে কোনও পদক্ষেপ করতে পরে না রাজ্য। না সুপ্রিম কোর্ট না হাইকোর্ট কাউকে কিছু না জানিয়েই সমীক্ষার পর ওবিসি তালিকা নিয়ে গেজেট নোটিফিকেশন করে রাজ্য যা দুই আদালতকেই অবমাননার সামিল বলেও মনে করে ডিভিশন বেঞ্চ। আর এখানেই শেষ নয়, বিধানসভাতেও এই তালিকা রিপোর্ট আকারে পেশ করা হয় যেখানে ২০১২ সালের আইন থাকা সত্ত্বেও তা বাতিল করে বা তর পরিবর্তনের কথা উল্লেখ না করে ৯৩ সালের আইনের কথা উল্লেখ করা হয় এবং তার ভিত্তিতেই গেজেট নোটিফিকেশন করা হয়। এখানেই ফের প্রশ্ন তোলে আদালত। বিচারপতিরা জানতে চান রাজ্য কি আদালতকে গুরুত্বহীন মনে করে? তাহলে আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আদালতকে না জানিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কেন? কেন নতুন নোটিফিকেশনে ২০১২-র গেজেট নোটিফিকেশনকে আড়াল করা হল ? ২০১০-এর তালিকায় থাকা হাইকোর্ট নির্দেশিত ৬৬ টি বৈধ সম্প্রদায়কে নতুন তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে কিনা তা হাইকোর্টকে জানানো হল না? যদিও অ্যাডভোকেট জেনারেল ডিভিশন বেঞ্চকে জানান, ওই ৬৬ সম্প্রদায়ের মধ্যে ২টি সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে সমীক্ষার মাধ্যমে আরও ৭৬টি নতুন সম্প্রদায়কে যুক্ত করে মোট ১৪০ জনের নয়া ওবিসি তালিকা তৈরি করেছে রাজ্য সরকার। সঙ্গে সঙ্গেই বিচারপতির রাজাশেখর মান্থা প্রশ্ন তোলেন ” প্রতি ১০ বছর অন্তর দেশজুড়ে পিছিয়ে পড়া মানুষজনের সমীক্ষা চালিয়ে তাদের আর্থসামাজিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন করা হয়। গত 15 বছর ধরে যারা বিভিন্ন সরকারি সুযোগ সুবিধার আওতায় রয়েছেন তাদের আর্থসামাজিক জীবনযাত্রার কতটা মান উন্নয়ন হয়েছে তার খোঁজ নিয়েছে রাজ্য সরকার? এই মানুষগুলোর জীবন ধারণের মানদন্ড কেমন ছিল তাকে আদৌ জানতে রাজ্য সরকার?
প্রশ্ন ওঠে, রাজ্যজুড়ে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের সমীক্ষার মতো বিশাল কর্মকান্ড এত কম সময়ের মধ্যে শেষ হল কোন উপায়ে? উল্লেখযোগ্য রাজ্যের নতুন ভাবে ওবিসি তালিকার নোটিফিকেশন নিয়ে যে মামলা করা হয়েছে ডিভিশন বেঞ্চে তার পিটিশনে এই সমীক্ষার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আদালতের নির্দেশের পরও রাজ্য সরকার যদি সমান্তরাল প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চায় সেটা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। ঠিক তখনই রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল বেশ কিছু আইনি ব্যাখ্যার যুক্তি তুলে ধরতে গেলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বিচারপতি তবব্রত চক্রবর্তী বলেন “আপনার যুক্তি ব্যাখ্যা দুদিন ধরেই শুনছি। আর নতুন করে প্যানডোরার বাক্স খুলবেন না।” পাশাপাশি বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা স্পষ্ট করে দেন দেন “গোটা ঘটনায় রাজ্য সরকার হাইকোর্টের নির্দেশ অর্ধেক পালন করেছে আর বাকি অর্ধেক নিজের মতো করে এগিয়েছে।” এর পর রাজ্য সরকারের নতুন গেজেট নোটিফিকেশন আপাতত কার্যকর করা যাবে না বলে জানিয়ে দিয়ে ৩১ জুলাই পর্যন্ত ওই নোটিফিকেশনের কার্যকারিতার উপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দেয় হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। আগামী ২৪ জুলাই ফের এই মামলার শুনানির দিন ধার্য করেছে হাই কোর্ট। আপাতত রাজ্যের সার্বিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার জন্য আগামী ২৪ জুলাই হাইকোর্টের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে গোটা রাজ্য। কারণ শুধু এসএসসি নয় মেডিকেল কাউন্সেলিং থেকে পিএসসি অথবা রাজ্যের বিভিন্ন আদালতে বিচারক ও হাই কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়াও থমকে যাবে সংরক্ষণের এই জটিলতার জন্য।
