ইজরায়েল-ইরানের মধ্যে চলতে থাকা উত্তেজনার মাঝে, বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় ভারতের একটি ছোট গ্রাম। উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকির কিন্তুর। কিন্তু হঠাৎ করে ইজরায়েল কিংবা ইরানের সঙ্গে কি এমন সম্পর্ক এই গ্রামের? আসলে, এই গ্রামের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের স্থপতি এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি।
১৮৩০ সাল নাগাদ উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকির কিন্তুর গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন শিয়া ধর্মগুরু ও পণ্ডিত সৈয়দ আহমদ মুসাভি হিন্দি। ব্রিটিশ শাসনের সময় ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের জন্য তিনি ভারত ছেড়ে ইরাক হয়ে ইরানে চলে যান। সেখানে গিয়ে তাঁর ভারতীয় পরিচয় বজায় থাকে তিনি তাঁর নামের সঙ্গে ‘হিন্দি’ শব্দটি বাদ দেননি। এর পর সৈয়দ আহমদ মুসাভি হিন্দি ইরানের খোমেইন শহরে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই তাঁর পরিবার গড়ে ওঠে। সৈয়দ আহমদ মুসাভি হিন্দির ছেলে মোস্তাফা হিন্দিও ছিলেন ধার্মিক। ১৯০২ সালে জন্ম হয় মোস্তাফার সন্তান রুহুল্লাহ খোমেইনির। তিনিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-ধর্মীয় নেতা। শাহ মোহাম্মদ রেজা পেহলভির পাশ্চাত্যপন্থী শাসনের বিরোধিতা করে তিনি গড়ে তোলেন এক বিপ্লব। যার ফলস্বরূপ ১৯৭৯ সালে জন্ম হয় ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের।
কিন্তু জানেন কি? খোমেইনির পরিবার আজও আছে উত্তরপ্রদেশের বারাবাঁকির কিন্তুরে! আজও সেই গ্রামের মহল মহল্লায় বাস করেন খোমেইনির পরিবারের বংশধররা। রয়েছেন নিহাল কাজমি, ডঃ রেহান কাজমি ও আদিল কাজমি’রা। তাঁদের বাড়ির দেওয়ালে আজও শোভা পাচ্ছে খোমেইনির ছবি। আদিল কাজমি বলেন, “তিনি নামের শেষে ‘হিন্দি’ যোগ করেছিলেন, কারণ তাঁর হৃদয় ভারতের জন্যই স্পন্দিত হত।” তিনি আরও জানান, “আমরা যখন ইরানে গিয়ে বলি আমরা কিন্তুর থেকে এসেছি, তখন আমাদের খুব সম্মান দেয়। সবাই জানে ওঁদের নেতা ভারতেরই সন্তান।”
খোমেইনির বংশধররা মনে করেন, শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, একটি আত্মিক উত্তরাধিকার পেয়েছেন তারা। আর সেই উত্তরাধিকার কিন্তুরের মাটিকে বিশ্ব ইতিহাসের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। তবে অনেক সময় একটা বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। আর সেটা হল, খোমেইনি নাকি খামেনেই? বিভ্রান্তি দূর করলেন সেই পরিবারেরই সদস্যরা। বর্তমান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই সম্পর্কে নানা জল্পনা চলছে। তিনি খোমেইনির উত্তরসূরি হলেও, কিন্তুরের সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্ক নেই। এ নিয়ে রেহান কাজমি পরিষ্কার জানিয়ে দেন, “খামেনেই খোমেইনির শিষ্য ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী। কিন্তুরের সঙ্গে বা আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁর কোনও রক্তসম্পর্ক নেই।”
ইজরায়েলের ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’ অভিযানে একের পর এক বিমান হামলা এবং ইরানের পাল্টা ড্রোন ও মিসাইল আক্রমণ! যার জেরে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বেগে রয়েছেন খোমেইনির ভারতীয় বংশধরেরা। রেহান কাজমি বলেন, “ইজরায়েলের হামলা অমানবিক। ইরান আত্মরক্ষার্থে জবাব দিচ্ছে। কিন্তু আমরা চাই যুদ্ধ থামুক, শান্তি ফিরে আসুক। রক্তপাত থেকে কারও লাভ হয় না।” আদিল কাজমি আরও বলেন, “হ্যাঁ, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের জন্য গর্ব করি। কিন্তু দুঃখও পাই যখন দেখি, তাঁর নাম যুদ্ধ আর হিংসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তাঁর পরিচয় জ্ঞান, ন্যায়বিচার আর দর্শনের মধ্যে নিহিত ছিল। আমরা চাই, পৃথিবী খোমেইনির নাম শান্তির প্রতীক হিসেবে চিনুক।” সারা বিশ্ব যখন মিসাইল নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত, তখন মানবতা আর শান্তির কথা বলছেন কিন্তুর খোমেইনির ভারতীয় বংশধররা।
