ধরি মাছ, না ছুঁই পানি, করেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে নেমেই পড়ল ট্রাম্পের আমেরিকা। জানা গিয়েছে, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার উড়ে এসে মার্কিন যুদ্ধবিমান ইরানের পরমাণু কেন্দ্র ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ইজরায়েলের বায়ুসেনা সহযোগীর ভূমিকায়। পাকিস্তান আনুষ্ঠানিক ভাবে শান্তির নোবেলের জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নাম সুপারিশ করেছে। ঘটনাচক্রে, তার ঠিক ২৪ ঘণ্টা পরেই ইরানে বোমা দাগল ট্রাম্পের দেশ।
ইজরায়েলের শত্রুকে নিজের শত্রু বলে ভেবে নেওয়া আমেরিকা অবশ্য এ বার শুরুতে যুদ্ধের ময়দানে ছিল না। কী করবেন ভাবতে হপ্তাদু’য়েক সময় নিয়েছিলেন ট্রাম্প। রবিবারই বোমা বর্ষণ শুরু হয়ে গেল। কেন আমেরিকাকে যুদ্ধে নামতে হল, তা নিয়ে আলোচনা চলবে। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, বাধ্যবাধকতা আছে কিছু। আমেরিকা আবার যুদ্ধে নেমেছে, এই খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে দেশে। অপ্রত্যাশিত না হলেও ঘটনার আকস্মিকতা বিহ্বল করেছে আমেরিকাকে। ‘নো মোর ওয়ার’ স্লোগান দিয়ে পথে নেমেছেন বহু মানুষ। তবে এখানেও মোচড় রয়েছে।
আমেরিকানদের একটা বিরাট অংশ মনে করেন, ইরানই আসল শত্রু। আজ নয়, বহুদিন থেকেই। তাই গর্তেই সাপ মেরে ফেলার এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়, বলেই জনপ্রিয় জনমত। এই অংশের আশঙ্কার প্রধান কারণ, ইরান মুসলিম শাসকদ্বারা পরিচালিত। তাদের উন্নাসিক মার্কিন মানসিকতা বুঝিয়েছে, খামেনেইয়ের ইসলামকেন্দ্রিক শাসন আমেরিকার সমৃদ্ধির পথে একমাত্র বাঁধা। আমরা যাকে বলি, সাদা চামড়ার রাজনীতি! আমেরিকার সমাজের বিরাট বড় অংশীদার এই অংশটি জাতীয়তাবাদী আবেগে ভেসে ট্রাম্পের পাশে থাকবে। পথে নামবেন অন্য অংশটি। সেটাই স্বাভাবিক। মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ইরানে আমেরিকার হামলাকে সংবিধানের চূড়ান্ত অবমাননা বলে অভিহিত করেছেন। রবিবার সকালে এক বিশাল জনসভায় বার্নি যখন এ বিষয়ে কথা বলা শুরু করেন, এক সময় জনতার সম্মিলিত ‘নো মোর ওয়ার’ স্লোগানে থেমে যেতে হয়। বার্নি বলেন, “আমি একমত। আমি আপনাদের একটা কথা বলতে চাই, এই মাত্র যে খবরটা শুনলাম, যেটা আপনারাও শুনলেন, সেটা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং সংবিধানের চরম বিরোধী। আপনারা সবাই জানেন, দেশকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কেবল মার্কিন কংগ্রেসের হাতে। প্রেসিডেন্টের সেই অধিকার নেই।”
বার্নি যেমন শুরু থেকেই ট্রাম্পের ইরান-নীতি নিয়ে সমালোচনার রাস্তায় হেঁটেছেন। ইজরায়েলের স্বার্থ যে আমেরিকার স্বার্থ নয়, তা-ও বলেছেন বার বার। কিন্তু ট্রাম্পকে আটকানো যায়নি। সম্ভবত ট্রাম্পের বদলে ওই চেয়ারে কমলা হ্যারিস থাকলেও আলাদা কিছুই ঘটত না। ইতিহাস বলে, বার বার আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়েছে, বিশ্বের নানা প্রান্তে, নানা স্বার্থে। আর আমেরিকান সমাজে তা বরাবরই বয়ে এনেছে বিপর্যয়। কোল খালি হয়েছে মায়ের, স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামীকে, কত সন্তান হারিয়েছে বাবাকে। এই ধারাবাহিক বিপর্যয়ই আবার জন্ম দিয়েছে এক শ্রেষ্ঠত্বের মন্ত্রকে। আমেরিকার সমাজ নিজেকে বুঝিয়েছে, ‘আমেরিকাকে আবার গ্রেট হতে হবে!’ যে সাম্রাজ্যে দাম বাড়বে না জিনিসের, বেঁচে থাকা হবে আরও মোলায়েম। সর্বত্র রামরাজ্য বিরাজমান। আর তা করতে কখনও ইরাক, কখনও ইরান টার্গেট হয়েছে। যে পরম্পরা আমাদের আমেরিকাকে নতুন করে চিনতে শেখায়।
