সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
জামানত খুইয়েও জনসমর্থনে দুই ফুলকে টেক্কা দিল হাত। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচনের নিরিখে ২০২৫-এ কালীগঞ্জের উপনির্বাচনে হাত চিহ্নের প্রার্থী জামানত খোয়ালেও জনসমর্থনে এগিয়ে রইল বাম-কংগ্রেস জোট। অন্যদিকে বাবার থেকে বেশি মার্জিনে মেয়ের জয় হলেও একুশের তুলনায় পঁচিশে প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়ল রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। উপনির্বাচনে জনসমর্থনের নিরিখে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে পদ্ম প্রার্থী। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে নদিয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে এটাই মূল নির্যাস। আপাতদৃষ্টিতে বাম কংগ্রেস জোটের এই ফল গত বিধানসভা নির্বাচনে শুন্য হয়ে যাওয়া দুই দলকে কিছুটা অক্সিজেন দিলেও পিছিয়ে থেকেও কিছুটা স্বস্তির এনে দিয়েছে রাজ্যের শাসকদলকেও। মূলত ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ভোট ভাগাভাগি রাজনীতিতে জোড়া ফুল শিবিরে অ্যাডভান্টেজ মিলবে তাও ফের বুঝিয়ে দিল কালীগঞ্জের এই উপনির্বাচন। আর হিন্দু মুসলিম অধ্যুষিত কালীগঞ্জের মাটিতে হিন্দু ভোট এককাট্টা করার ক্ষেত্রে পদ্ম শিবিরের টোটকায় ফের বাধা হল বাম-কং জোট, তাও স্পষ্ট হয়েছে এই উপনির্বাচনে।
এমনিতেই উপনির্বাচনের শাসকদলের জয় নিয়ে নিশ্চয়তা ছিলই। সদ্য সমাপ্ত কালীগঞ্জ বিধানসভার উপনির্বাচনে প্রত্যাশা মতই ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী আলিফা আহমেদ। কালীগঞ্জের মোট ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৮৭৭ বৈধ ভোটের মধ্যে তাঁর প্রাপ্ত ভোট ১ লক্ষ ২ হাজার ৭৫৯। যদিও একুশের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় ২৫ এর উপ নির্বাচনে কালীগঞ্জ বিধানসভায় শাসক দলের প্রার্থীর ভোট কমেছে ৮,৯৩৭। পক্ষান্তরে বিজেপি প্রার্থী এই উপনির্বাচনে ৫২ হাজার ৪২৪ ভোট পেলেও একুশের নির্বাচনের তুলনায় ১২ হাজার ২৮৫ ভোট কম পেয়েছেন। প্রাপ্ত ভোটের শতাংশের বিচারে ২৮ শতাংশের একটু বেশি। নদিয়ার কালীগঞ্জ বিধানসভা এলাকায় হিন্দু ও মুসলিম জনবসতি মিলেমিশে রয়েছে। সেক্ষেত্রে একুশে নির্বাচনের পাশাপাশি ২৫ এর উপনির্বাচনেও হিন্দু ভোট এককাট্টা করার ক্ষেত্রে পদ্ম শিবির যে ধারাবাহিক প্রচার ও কর্মসূচি চালিয়েছে তা যে কার্যকর হয়নি সেটা স্পষ্ট হয়েছে। এই বিষয়টি জোড়া ফুল শিবিরের কাছে অবশ্যই স্বস্তির কারণ হতে পারে। পাশাপাশি এই উপনির্বাচনের রাজনৈতিক ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল প্রাপ্ত ভোটের নিরিখে জামানত বাজেয়াপ্ত হলেও বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী একুশের নির্বাচনের তুলনায় এবারের উপনির্বাচনে ৩ হাজার ১৮৬ ভোট বেশি পেয়েছেন। এই উপনির্বাচনে জামানত বাজেয়াপ্ত হলেও বাম সমর্থিত কংগ্রেস প্রার্থী ১৫ শতাংশের সামান্য বেশি ভোট পেয়েছেন। আর এটাই বাড়তি অক্সিজেন যুগিয়েছে রাজ্যের শাসক দল জোড়াফুল শিবিরে। একুশে নির্বাচনের আগে থেকেই রাজ্যের প্রধান বিরোধী বিজেপির পক্ষ থেকে লাগাতার প্রচার করা হয়েছে যে বাম এবং কংগ্রেসকে কাজে লাগিয়ে পদ্ম শিবিরের ভোট কাটাকাটি রাজনৈতিক খেলা খেলছে তৃণমূল কংগ্রেস। তাই বাম কংগ্রেসের এই জোটকে ভোট না দিয়ে একের বিরুদ্ধে এক ভোটদানে ভোটারদের উৎসাহিত করেছে বিজেপি। বিশেষ করে রাজ্যের হিন্দু ভোটারদের ক্ষেত্রে নানাভাবে হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িয়ে হিন্দু ভোটকে নিজেদের বাদে আনতে মরিয়া প্রচেষ্টা চালিয়েছে পদ্ম শিবির। যদিও একুশের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সেটা যেমন পুরোপুরি সফল হয়নি সেই ধারাবাহিকতা দেখা গেল ২৬ এর বিধানসভার সাধারণ নির্বাচনে প্রাক্কালে কালীগঞ্জের এই উপনির্বাচনের ক্ষেত্রেও। শাসক দলের জয় প্রত্যাশিত থাকলেও বিরোধী ভোটের ভাগাভাগির অংকে রাজনৈতিক অ্যাডভান্টেজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থাতেই থাকলো শাসক তৃণমূল। একইসঙ্গে একুশের নির্বাচনে আসন সংখ্যায় শূন্য হয়ে যাওয়া বাম কংগ্রেসের জনসমর্থন যে এখনো শূন্য হয়ে যায়নি সে কথা বলার জায়গায় রইল রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণু এই দুই বিরোধী শক্তি। সব মিলিয়ে ভোট ভাগাভাগির অংকে ক্ষমতার গদিতে টিকে থাকার রাজনৈতিক ট্রাডিশন বজায় রাখার ইঙ্গিত দিল কালীগঞ্জের এই উপনির্বাচন।
