আকাশ জুড়ে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি ভেজা সকাল বেলায় মনটা বেশ ভরে যায় আমার। শ্রাবণের মেঘ ভাঙা বৃষ্টি নয়। তবু এই বৃষ্টি এলেই মনে পড়ে যায় আমার সেই রথের কথা, সেই প্রভু জগন্নাথ এর রথ যাত্রাকে ঘিরে ধুমধাম উৎসবের কথা। সেই হুগলী জেলার মহেশের রথের মেলায় রাধারাণীর হারিয়ে যাওয়ার কথা। সেই গুপ্তিপাড়ার রথে গুলি চলার কথা, সেই বিখ্যাত পুরীর মন্দিরের আশেপাশে সরু রাস্তার ধারে খাজার দোকানের ম ম গন্ধের কথা। সেই নীলাচলে মহাপ্রভুর হারিয়ে যাওয়ার কথা। বাঙালির চির চেনা সেই পুরী ঘুরতে গিয়ে ব্যাগ ভরে মাথায় করে ঝুড়ি ভরে খাজা নিয়ে বাড়ী ফেরার কথা। আর বাড়ী বাড়ী সেই খাজা বিলি করে পুরী ঘোরার পর নিজের অভিজ্ঞতার কথা একে ওকে বলে অনিন্দ্য আনন্দ পাওয়ার কথা।
কিন্তু সেই পুরীর ‘খাজা’ আজ বাড়ী বাড়ী বিলি করা হচ্ছে জগন্নাথের প্রসাদ হিসেবে। ঠিক যেমন করে সেই অযোধ্যার রাম মন্দিরের প্রতিষ্ঠার ঠিক আগে বাড়ী বাড়ী বিলি করা হয় হলুদ ‘অক্ষত’ চাল। প্রভু শ্রী শ্রী রামচন্দ্রের অযোধ্যায় মন্দির প্রতিষ্ঠার আগেই বাড়ী বাড়ী পৌঁছে যায় এই ‘অক্ষত’ হলুদ চাল গৃহস্থের মঙ্গল কামনায়। ২০২৪ এর ২২ শে জানুয়ারী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী এই রামমন্দির এর প্রতিষ্ঠা করেন। আর সেই মন্দির প্রতিষ্ঠার আগেই সেই ২০২৪ এর পয়লা জানুয়ারী থেকে পনেরো জানুয়ারী পর্যন্ত এই এক পক্ষ ধরে চলে ‘অক্ষত’ চাল বিলির প্রক্রিয়া। যা নিয়ে সারা দেশেই সাড়া পড়ে যায়। বিজেপির এই মন্দির রাজনীতি নিয়ে আর চাল বিলি নিয়ে কতই না চর্চা হয়। যে চর্চার সাথে সাথে এখন এই সমান তালে পাল্লা দিচ্ছে প্রভু জগন্নাথের প্রসাদ খাজা বিলির রাজনীতি। যা নিয়ে এখন রথ যাত্রার আগেই সাজ সাজ রব পড়ে গেছে চারিদিকে রাজ্য জুড়ে।
আসলে এই চাল বিলির চলচ্চিত্র আর প্রভু জগন্নাথের খাজা বিলির চিত্রনাট্য রূপ নিয়ে নির্দেশনায় সেই বিখ্যাত যাত্রাপালার রূপকার ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায় এর মস্তিষ্ক প্রসূত আর এস এস এর ভাবনা কাজ করেছে বলে অনেকে মনে করেন। বিজেপির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভাবনা নিয়েই বা আর এস এস এর ভাবনা নিয়েই ঘরে ঘরে মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে চাল বিলির প্রক্রিয়া যেমন শুরু করে দেওয়া হয়। আর সেই এক চটিতে পা গলিয়ে পচা শামুকে পা কেটে দীঘার সমুদ্র সৈকতের ধারে নতুন জগন্নাথ মন্দির স্থাপন করে রথের চাকা গড়িয়ে যাবার আগেই খাজা বিলি করে মা মাটি আর মানুষের জন্য কাজ করা সরকার। একদম কেন্দ্রীয় দল বিজেপিকে অনুসরণ করেই রাজ্য রাজনীতির ময়দানে সদর্পে টিকে থাকার চেষ্টা করা। এটাই যে আমাদের দেশের আর রাজ্যের রাজনীতি।
যে রাজনীতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকা চাল আর খাজাকে আঁকড়ে ধরেই। যেখানে দারিদ্র্য, বেকার সমস্যা, দেশের মানুষের কাছে দু বেলা খাবার পৌঁছে দেওয়া, একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া দেশের যুব সমাজের মধ্যে, দেশে বা রাজ্যে শিল্প এলাকা তৈরি করে দেশের অর্থনৈতিক মানকে আরও উন্নয়ন করা, শুধু বিশেষ দু একটি ব্যবসা করা ব্যক্তি আদানি আর আম্বানি নয় সবার জন্য শিল্পের বাজারকে উন্মুক্ত করে দেওয়া। এমন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কই আমাদের। রাজ্য জুড়ে শুধুই নিজের সরকারের প্রচার করা ছাড়া আর তথ্য দিয়ে জাগলারি করা ছাড়া কাজের কাজ কই। যে কাজ নাকি আর কিছুই বাকি নেই এই মাটির গন্ধ মাখা রাজ্যে।
যতই চাকরি চুরি নিয়ে হৈ চৈ হুল্লোড় হোক। যতই রাজ্যের নানা মন্ত্রীদের জেল যাত্রা হোক কিন্তু চাল আর খাজা নিয়ে দেশ ও রাজ্য জুড়ে ঠিক অপারেশন সিঁদুর এর মতোই একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছে দু তরফেই। যাতে মন্দির কে সামনে রেখে নিজেদের স্বার্থে রাজনীতির ময়দানে নিজেদের দলের ঢক্কানিনাদ বাড়িয়ে নেওয়া যায়। আর ঠিক তাকে অনুসরণ করেই প্রভু জগন্নাথ এর রথ যাত্রার আগেই এই খাজা বিলির প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। জয় জগন্নাথ বলে। প্রভু রামের সেই হলুদ ‘অক্ষত’ চাল আর প্রভু জগন্নাথের সেই ‘ খাজা ‘ কিন্তু বেশ ভালই বাজারে বিকোচ্ছে হৈ হৈ করে। জয় জগন্নাথ। জয় শ্রী রাম। এই না হলে আমাদের দ্রুত এগিয়ে চলা দেশ, আর দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলা রাজ্য। জয় শ্রী রাম। জয় জগন্নাথ।
