সন্দীপন বিশ্বাস
বাংলা চলচ্চিত্রে সেরা পাঁচটি প্রেমের রোমান্টিক গানের কথা ভাবলে, যেগুলি মনে আসবে, সেই পাঁচটি গান অবশ্যই উত্তমকুমার অভিনীত। যেমন ধরা যাক ‘হারানো সুর’ ছবির ‘তুমি যে আমার’, ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই’, ‘সপ্তপদী‘ ছবির ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’, ‘শঙ্খবেলা’ ছবির ‘কে প্রথম কাছে এসেছি, কিংবা ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ ছবির ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’। এইটুকু পড়েই পাঠকরা ‘রে রে’ করে উঠে বলবেন, ‘শুধু এইটুকু? আরও আছে। গুরুর কণ্ঠে প্রেমের গান শত শত।’ হ্যাঁ স্বীকার করতেই হবে যে গুরুর কণ্ঠে অজস্র প্রেমের গান রয়েছে, যেসব আজও অমর। একসময় এইসব গানের পংক্তি ব্যবহার করে বাঙালি যুবকরা প্রেমের চিঠি ভরিয়ে তুলতেন। আসলে উত্তমকুমার হলেন বাঙালির নিজস্ব এক আইকন। তিনি ছিলেন এক প্রেমের আইডল। দূর গ্রহের অধরা স্বপ্নের পুরুষ হলেও তিনি ছিলেন প্রতিটি বাঙালির হার্টথ্রব।
‘উত্তমকুমারের ছবি’ বলতে মেয়েরা তখন পাগল। পর্দায় প্রথম উত্তমকুমারের উপস্থিতি মানেই বহু মেয়ের বুকের ভেতর এক ঝাঁক পায়রা উড়ে যাওয়া। অ্যাড্রিনালিন গ্রন্থিতে ছলকে উঠত রক্ত। তাঁদের বইয়ের পাতায় কিংবা গানের খাতার ভিতরে থাকত খবরের কাগজ থেকে কাটা উত্তমকুমারের ছবি। পরিযায়ী সময় নিউজপ্রিন্টে ছাপা ছবিকে আজ বিবর্ণ করে দিয়েছে কিংবা সেই ছবি কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, কে তার খোঁজ রাখে। সেই মানুষটিও বিদায় নিয়েছেন কতদিন হয়ে গেল। কিন্তু বিবর্ণ হয়নি তাঁর জনপ্রিয়তা, বিবর্ণ হয়নি তাঁর গ্ল্যামার, বিবর্ণ হয়নি সেলুলয়েডের ফ্রেম টু ফ্রেম ধরে রাখা তাঁর অভিনয়। যেন ফ্রেমবাঁধানো প্রেম।
আসলে এক অদৃশ্য চৌম্বক শক্তি ছিল তাঁর মধ্যে। কী অসাধারণ তাঁর সম্মোহন শক্তি! সেটা কেউ বলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব, কেউ বলেন রূপ, কেউ বলেন তাঁর হাসির টান, কেউ বলেন, কী গভীর প্রেমের দৃষ্টি, আবার কেউবা বলেন, অমন অসাধারণ অভিনয় করতে কাউকে দেখিনি। আসলে উত্তমকুমার হলেন এই সমস্ত কিছুর নিরিখে বাঁধা একজন পুরুষ। এক সম্মোহন বৃত্ত, যাঁকে দেখে দেখে আঁখি না ফেরে।
তাই সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রেমের দেবতা। সেলুলয়েডে বাঙালি সম্ভবত এমন কন্দর্পদেবকে আগে কিংবা পরে অনুভব করেনি। ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির সেই দৃশ্যটা তো সুপার হিট! সেই যে দৃশ্যে চিন্ময় রায় তাঁর প্রেমিকা শিবানী বসুকে বলছেন, ‘তুমি একবার আমাকে বল না উত্তমকুমার।’ এই আকুতি ছিল তখনকার প্রতিটি পুরুষের মধ্যে। তাঁরা প্রত্যেকেই প্রেমিক হিসাবে উত্তমকুমার হয়ে উঠতে চাইতেন। আসলে বাঙালি মেয়েরা চাইতেন মূলত এমন একজন ব্যক্তিত্ববান, দায়িত্বশীল, কিছুটা উদাসীন এবং রোমান্টিক এক পুরুষ, যাঁর আদল উত্তমকুমারের মতো। ছবিতে যেভাবে তাঁকে তৈরি করা হয়েছে, সে এক আদর্শ পুরুষ। স্মার্ট, সুশ্রী, রুচিশীল, সহানুভূতিশীল, সহমর্মী, সৃজনশীল, উদার দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন, বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ইত্যাদি গুণগুলি সাধারণ দর্শকদের কাছে তাঁকে এক আদর্শ পুরুষ হিসাবে সৃষ্টি করেছে।
কেন এই উত্তম-ম্যাজিক! কেন তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রেমের কেষ্ট ঠাকুর? সেটাকে বিচার করার জন্য তাঁর প্রতিটি ছবির বিচার করা দরকার। প্রতিটি ছবি জুড়েই তাঁর প্রেমের অনন্য বিন্যাস। এক শাশ্বত প্রেমের প্রতীক হয়ে তিনি রয়ে গিয়েছেন মৃত্যুর এতদিন পরেও। উত্তমকুমারের প্রতিটি ছবি বিশ্লেষণ করলে প্রেমের একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রাপ্তি, ভালোবাসার নিটোল বাঙালি ঘরানা উঠে আসে। মধ্যবিত্ত প্রেমের এই ভিন্ন ডায়মেনশনটাকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এক একটা ছবিতে তাঁর প্রেমের এক একটা শেড। তাঁর ছবির অন্যতম উপাদান রোমান্স। ভালোবাসার চালচিত্রের মতো সারা ছবিতে তা ছড়িয়ে থাকত। সেই রোমান্সের মূল শক্তি যদি হয় তাঁর অভিনয়, তাহলে অন্যটি ছিল তাঁর হাসি ও গ্ল্যামার। একবার জহর রায় মজা করে বলেছিলেন, ‘অমন ভুবনমোহিনী হাসি দেখলে মেয়েরা প্রেমে পড়বেই। আমি তো পুরুষ হয়েও প্রেমে পড়েছি।’ কথাটা শুধু কৌতুক বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। তাঁর রোমান্স ও প্রেম, তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন পুরুষ দর্শকরাও। তাঁরাও প্রেমিক হিসাবে উত্তমকুমার হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন।
একটু খোলা চোখে বিচার করলেই আমরা দেখি, ‘সাগরিকা’র প্রেম আর ‘সপ্তপদী’র প্রেম এক নয়। ‘হারানো সুর’ এবং ‘পৃথিবী আমারে চায়’ ছবির প্রেম এক নয়, ‘সবার উপরে’ কিংবা ‘শাপমোচন’ ছবির রোমান্স এক নয়, ‘লালপাথর’ আর ‘স্ত্রী’ ছবির প্রেমও ভিন্ন। ‘বিপাশা’র প্রেম এবং ‘দেয়া নেয়া’র প্রেমও আলাদা। ‘পথে হল দেরি’ ছবিতে প্রেম যেখানে ত্যাগের মধ্য দিয়ে মিলনের পথে এগোয়, ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির প্রেম সেখানে পৃথক মহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘মেমসাহেব’ ছবিতে উত্তমকুমারের প্রেমের যে নাব্যতা, ‘শুন বরনারী’ ছবির প্রেমের সাম্পান সেই নদীতে ভাসে না। ‘বিকেলে ভোরের ফুল’ কিংবা ‘আমি সে ও সখা’ ছবির প্রেমও ভিন্নমুখী। আবার ‘সোনার খাঁচা’ ছবির প্রেম যেন দমবন্ধ করা এক অত্যাচার হয়ে ওঠে। ‘শেষ অঙ্ক’ ছবির প্রেমের রূপ যখন সত্যিই প্রকাশ পায়, তখন দর্শক চমকে ওঠেন। খ্যাতির মধ্যগগনে থেকেও এমন অ্যান্টিহিরোর অভিনয় করা মুখের কথা নয়। বলতে হয় ‘বনপলাশীর পদাবলী’ ছবির কথা। প্রেমিক হিসাবে নিজেকে ভেঙেছেন দ্বৈত সত্তায়। এইসব ছবিতে দ্বিমাত্রিক ব্যঞ্জনার ভিতরে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের জটিলতা উঁকি মারে। প্রেমের বহুমুখী নির্যাস তাঁর ছবিতে ভরপুর। সেই প্রেম কিংবা প্রেমহীনতাকে স্থায়ী এবং সুষ্ঠুভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন অভিনয়ের মধ্য দিয়ে। তিন দশক ধরে তিনি ছিলেন ‘কিং অব রোমান্স’।
উত্তমকুমারের এই যে একচ্ছত্রভাবে কিং অব রোমান্স হয়ে ওঠা, এর পিছনে কারণ কী? শুধুই দর্শনধারী, শুধুই অভিনয়, নাকি আরও অন্যকিছু! যা কেবল অনুভব করা যায়, উপলব্ধি করা যায়! উত্তমকুমারের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যদি তাঁর রূপ বলে মনে করা যায়, তাহলে সেটা মস্ত ভুল হবে। কী অন্তরঙ্গে , কী বহিরঙ্গে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক পুরুষ। সেই আকর্ষণকে আরও গভীরতর করে তুলেছিল তাঁর অভিনয়। তিনি এসে বাংলা ছবির প্রেমের আবহটাকেই একেবারে বদলে দিলেন। প্রেম উঠে এল চলন্ত বাইকের ছন্দোময় গতিতে। সেই গতির সঙ্গে মিশে গেল সুর। এভাবেই প্রেম হয়ে উঠেছে হৃদয়ের অলঙ্কার। অভিনয় হয়ে উঠেছে বাস্তব, রোমান্সের টান ছিল খরস্রোতা নদীর মত।
তিনি জানতেন পরিবর্তিত সময়ে যখন দেশ ও ইতিহাস বদলাচ্ছে, মানুষের অস্তিত্বের বোধ পলকা হয়ে যাচ্ছে। দেশভাগ, বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে মানুষের সমাজে এল নানা পরিবর্তন। সেই মধ্যবিত্তের সঙ্গে আগের মধ্যবিত্তের কোনও মিল নেই। সেই নতুন যুগে সেই নব মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে তিনি জুগিয়ে দিলেন বিনোদনের সুস্বাদু পানীয়। এই জোগানটা দিতে পেরেছিলেন বলেই উত্তমকুমার সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন একটা যুগ। কিন্তু তাঁর রোমান্স কখনওই তথাকথিত যৌনতার কাছে আত্মসমর্পণ করেনি। কোনও সস্তা পথ তাঁকে ধরতে হয়নি। তাঁর প্রেরে অভিনয় এসেন্সের মতো ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদের মধ্যে। আমাদের ভিতরেও সুন্দরবোধকে, আদর্শ এক প্রেমসত্তাকে জাগিয়ে তোলে। আমাদের প্রেমিক ও প্রেমিকা হতে সাহসী করে তোলে। সেই টান আজও অক্ষত। অন্তহীন সেই অভিযাত্রা। আজও আমাদের মন তাঁর দিকে তাকিয়ে গেয়ে ওঠে, ‘আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস, / দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।’
