২০২৫ সাল যেন যুদ্ধেরই বছর। মাত্র ৭ মাসের মধ্যে তিনটি যুদ্ধ দেখেছে বিশ্ব। প্রথমে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হয়। তারপর ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল। ওদিকে রাশিয়া আর ইউক্রেনের যুদ্ধ তো থামার নাম নেই। এখন আবার থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সেনাবাহিনী একে অপরের উপর আক্রমণ চালাচ্ছে। থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী এলাকায় রকেট হামলা চালিয়েছে কম্বোডিয়া। এর জবাবে কম্বোডিয়ার সামরিক ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালিয়েছে থাই বিমান বাহিনী।
উত্তর কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ড সীমান্তে ঘটছে এই যুদ্ধ। থাইল্যান্ডের সুরিন এবং সিসাকেট রাজ্যগুলি প্রভাবিত হয়েছে এই যুদ্ধে। কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধের আসল কারণ হল এই অঞ্চলের হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা। প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক কেন এবং কীভাবে হঠাৎ করে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হল।
বৃহস্পতিবার সকাল ৭:৩০ নাগাদ, সুরিনের ‘তা মুয়েন থম’ নামক একটি মন্দিরের উপরে কম্বোডিয়ান সেনাবাহিনীর একটি ড্রোন দেখতে পান থাই সেনারা। এর পরে, থাই সামরিক ঘাঁটির কাছে ৬ জন সশস্ত্র কম্বোডিয়ান সৈন্যকে দেখা যায়। তাঁদের হাতে গ্রেনেড লঞ্চার ছিল।
কম্বোডিয়ান সেনাদের উস্কানিমূলক পদক্ষেপ নিয়ে উভয় দেশের সেনাদের মধ্যে বিতর্ক শুরু হয়। এর পর রাত প্রায় সাড়ে ৮ নাগাদ থাইল্যান্ডের সামরিক ঘাঁটিতে গুলি চালাতে শুরু করে কম্বোডিয়ান সেনারা। থাইল্যান্ড অভিযোগ করে, রাত ৯টার দিকে কম্বোডিয়ান সেনাবাহিনী তাদের ‘তা মুয়েন থম’ মন্দিরে আক্রমণ করে, যার পরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এই গুলিবর্ষণে কিছু থাই সেনা আহত হন। এরপরই কম্বোডিয়ায় বড় ধরনের আক্রমণ চালায় থাইল্যান্ড। কম্বোডিয়া কেবল সুরিন মন্দিরকেই নয়, ‘সি সা কেট রাজ্যের ডন টুয়ান মন্দিরকেও রকেট হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। থাইল্যান্ড দাবি করছে, ইচ্ছাকৃতভাবে মন্দির এবং আবাসিক এলাকাগুলিকে টার্গেট করছেন কম্বোডিয়ান সেনারা।
থাইল্যান্ড এবং কম্বোডিয়ার মধ্যে প্রচণ্ড গোলাগুলি চলছে। কম্বোডিয়া জানিয়েছে, থাইল্যান্ড থেকে আক্রমণ শুরু হয়েছিল। অন্যদিকে থাইল্যান্ড দাবি করেছে, তাদের অঞ্চলে রকেট এবং কামান ব্যবহার করা হয়েছিল এবং প্রতিক্রিয়ায় থাইল্যান্ড এফ-১৬ বিমান দিয়ে কম্বোডিয়ার সামরিক ঘাঁটিগুলিকে টার্গেট করে।
একাদশ শতাব্দীর প্রিয়াহ ভিহিয়ার মন্দির থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে যুদ্ধের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মন্দিরটি কম্বোডিয়ার প্রিয়াহ ভিহিয়ার প্রদেশ এবং থাইল্যান্ডের সিসাকেট প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত রায় দেয়, এই মন্দিরটি কম্বোডিয়ার, কিন্তু উভয় দেশই মন্দিরের আশপাশের ৪.৬ বর্গকিলোমিটার জমি দাবি করে। থাইল্যান্ড বলে, এই জমিটি তাদের। অন্যদিকে কম্বোডিয়া মনে করে মন্দিরটি রয়েছে তাদের অংশে।
উল্লেখ্য, যে মন্দির নিয়ে এত ঝামেলা, সেই মন্দিরটি একাদশ শতাব্দীতে খেমার সম্রাট সূর্যবর্মণ ভগবান শিবের জন্য তৈরি করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে, এই মন্দিরটি কেবল বিশ্বাসের কেন্দ্র নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, রাজনীতি এবং সামরিক শক্তির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। এই মন্দিরে এখনও একটি শিবলিঙ্গ রয়েছে।
থাইল্যান্ড আর কম্বোডিয়ার বিরোধের সূত্রপাত ১৯০৭ সালে। তৎকালীন কম্বোডিয়ার ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্স এই মন্দিরটির একটি মানচিত্র তৈরি করে। থাইল্যান্ড কখনওই এই মানচিত্রটি পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। ২০০৮ সালে, যখন কম্বোডিয়া এই মন্দিরটিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করে, তখন থাইল্যান্ড এর বিরোধিতা করায় বিরোধ আরও বেড়ে যায়। এর পরে, ২০০৮-২০১১ সাল পর্যন্ত দুই দেশের লড়াইয়ে অনেক মানুষের প্রাণ যায়।
এই মুহূর্তে কম্বোডিয়ার কাছে একটি ভালো যুদ্ধবিমানও নেই। তাই থাইল্যান্ডের বিমান হামলা নিয়ে তারা চিন্তায় রয়েছে। তবে মনে করা হচ্ছে, যুদ্ধ বন্ধ না হলে একত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে চীন। যদিও কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ড উভয়ের সাথেই চীনের সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে থাইল্যান্ডের সঙ্গে চীনের গভীর অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব রয়েছে। চীন থাইল্যান্ডের কাছে অস্ত্রও বিক্রি করেছে। তাহলে কি চীন এখন দুর্বল কম্বোডিয়ার উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাবে? চীন ও থাইল্যান্ডকে একসঙ্গে কীভাবে রুখবে কম্বোডিয়া, উঠছে সেই প্রশ্নও।
