দিল্লি বিধানসভার ভিতরে কি আদৌ কোনও ফাঁসিঘর আছে? ব্রিটিশ আমলে যে ফাঁসি ঘরে জেলবন্দিদের ফাঁসি দেওয়া হত?
গত কয়েক দিন ধরেই এই প্রশ্নটি নিয়ে তোলপাড় হচ্ছে রাজধানী। তবে ইতিহাসবিদদের দাবি, দিল্লি বিধানসভার মধ্যে আদৌ কোনও ফাঁসিঘর নেই।
১৯১২ সালে তৈরি হয়েছিল দিল্লি বিধানসভা। তবে সে সময় এটি বিধানসভা ছিল না। বলা হত ইম্পিরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল। যার নকশা প্রস্তুত করেছিলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ ই মন্টেগু টমাস। ফকির চাঁদের নামে এক প্রযুক্তিবিদের তদারকিতে এই ভবন মাত্র ৮ মাসের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল। ১৯১৯ সাল থেকেই এই ভবন সেন্ট্রাল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি হিসেবে কাজ শুরু করে।
লেখক সোহেল হাশমির দাবি, দিল্লি বিধানসভা ভবনের মধ্যে কোনও ফাঁসিঘর থাকা নিতান্তই কষ্ট কল্পনা। ইতিহাসবিদ স্বপ্না লিডলে দাবি করেছেন, দিল্লি বিধানসভার ভিতরে ফাঁসিঘরের কোনও অস্তিত্ব নেই। এটা সচিবালয় হিসেবে তৈরি হয়েছিল। তাই সেখানে কখনও কাউকেই ফাঁসি দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, সেখানে কাউকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল এমন কথা তিনি কখনও শোনেননি।
জনশ্রুতি আছে দিল্লি বিধানসভা থেকে লালকেল্লা পর্যন্ত একটি গোপন সুড়ঙ্গ আছে। এই সুড়ঙ্গের অস্তিত্বও মানতে নারাজ সোহেল এবং স্বপ্না।
এ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, দিল্লি বিধানসভার ভেতরে কোনও ফাঁসিঘরের অস্তিত্ব তাঁদের চোখে পড়েনি। এর আগে কোনও সরকারও এই বিষয়ে কখনও কোনও কথা বলেনি।
দিল্লি বিধানসভার অধ্যক্ষ বিজেন্দ্র গুপ্তা বলেছেন, দিল্লি বিধানসভার মধ্যে ফাঁসিঘর আছে এমন কোন ইতিহাস তাঁর জানা নেই। স্বাভাবিকভাবেই সেখানে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে এমন কথা বলার কোনও যুক্তি নেই। যে ঘরের কথা বলা হচ্ছে সেই ঘর বিধানসভার সদস্যদের টিফিন খাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। বিধানসভা ভবনের মূল পরিকল্পনার মধ্যেই ছিল ওই ঘর। দিল্লিকে ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ঘোষণার পর এই বিধানসভা ভবনের একটা আলাদা গুরুত্ব তৈরি হয়েছিল।
দিল্লি বিধানসভার ভিতরে ফাঁসিঘরের অস্তিত্ব নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রাক্তন শাসক দল আপের সঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
বিজেপি বিধায়ক তথা বিধানসভার অধ্যক্ষ বিজেন্দ্র গুপ্তার দাবি, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল ফাঁসিঘর থাকার যে দাবি করেছিলেন তার কোন ভিত্তি নেই। অধ্যক্ষের দাবিকে সমর্থন করেন বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী প্রবেশ সাহেব সিং।তিনি বলেন, কেজরি সরকারের অধ্যক্ষ রামনিবাস গোয়েল ফাঁসিঘরের কথা উপস্থাপন করেছিলেন।
শাসক দল বিজেপির পক্ষ থেকে যখন ফাঁসিঘর থাকার অস্তিত্ব উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে তখন তার প্রতিবাদ জানান আপ বিধায়ক তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অতিশী। তিনি বলেন, ফাঁসিঘরের মত একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে আসলে বিজেপি সরকার মানুষের সমস্যা থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে চাইছে। এভাবেই তারা মানুষের করের টাকার নয়ছয় করছে।
বিধানসভার মধ্যে ফাঁসিরঘরের অস্তিত্ব নিয়ে বুধবার থেকে দিল্লি বিধানসভায় বিতর্ক জমে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্ত বলেছেন, ইতিহাসের অপব্যাখ্যা করে শহিদদের অসম্মান করা হচ্ছে। যা সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের উপর আঘাত। বিজেপি বিধায়ক তথা মন্ত্রী কপিল মিশ্র আপকে কটাক্ষ করে বলেন, বিরোধী দল ইতিহাসকে বিকৃত করতে চাইছে। সে জন্যই তারা ভুয়ো খবর রটাচ্ছে।
যদিও বিজেপির এই দাবি মানতে নারাজ আপ বিধায়ক সঞ্জীব ঝা। তিনি বলেছেন, দিল্লি বিধানসভায় একটি ফাঁসি ঘর ছিল। যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে এ ধরনের ফাঁসিঘরের অস্তিত্ব যে নথিবদ্ধ থাকবে না সেটাই স্বাভাবিক।
বুধবার ফাঁসিঘর নিয়ে বিজেপি ও আপ বিধায়কদের তর্কাতর্কিতে যখন বিধানসভা উত্তাল হয়ে উঠেছে তখন বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন অধ্যক্ষ বিজেন্দ্র গুপ্তা।তিনি বলেন, এই বিধানসভা ভবনের এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। সেই ঐতিহ্য ও গুরুত্বকে রক্ষা করে চলতে হবে। দেশের নতুন প্রজন্মের কাছে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে হবে। সত্যের অপলাপ কখনওই ঠিক নয়।
দিল্লি বিধানসভার বাদল অধিবেশনে এবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এই ফাঁসিঘর ইসু কে কেন্দ্র করে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অতিশীর দাবি, বিধানসভার ভিতরেই ছিল ফাঁসি ঘর এবং বিধানসভা ভবন থেকে লালকেল্লা পর্যন্ত ছিল একটি গোপন সুড়ঙ্গ। যদিও অতিশীর ওই দাবি মানতে নারাজ বিজেপি। যা নিয়ে বিজেপি ও আপ বিধায়কদের থতীব্র বাকযুদ্ধ শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অতিশী এবং আপের বেশ কয়েকজন বিধায়ককে মার্শাল ডেকে বের করে দেন অধ্যক্ষ।
