সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫৬ অনুযায়ী, রাজ্যের একজন মুখ্যসচিব পর্যায়ের সর্বোচ্চ পদাধিকারী কখনই কেন্দ্রীয় আইনের পরিপন্থী হয়ে কোনও কাজ করতে পারেন না। এবং সেই কাজকে সমর্থনও করতে পারেন না। রাজ্যের সর্বোচ্চ সরকারি প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মুখ্যসচিবকে এমন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় রাখার মূল লক্ষ্য হল, দেশজুড়ে একটি ঐক্যবদ্ধ আইনি কাঠামো বজায় রাখা। ভোটার তালিকার মতো সাংবিধানিক ক্ষেত্র যা দেশবাসীর সাংবিধানিক অধিকারের আওতায়, সে ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধি-নিষেধ লঙ্ঘনে যারা অভিযুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপে একজন মুখ্য সচিব যদি অপারগ হন, তা কিন্তু সংবিধান লঙ্ঘনের নামান্তর বলেই বিবেচ্য বলে মনে করছেন নির্বাচন কমিশনের পদাধিকারীরা। আর এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বা দায়বদ্ধতাকে মাথায় নিয়েই বুধবার নির্বাচন কমিশনে কার্যত অগ্নিপরীক্ষায় রাজ্যের মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ (১৯৯১ সালের আইএএস ব্যাচ)।
গত ৫ আগস্ট ভোটার তালিকায় অস্তিত্বহীন ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগে তদন্তের ভিত্তিতে রাজ্যের ২ ইআরও এবং ২ এইআরও-কে সাসপেন্ড করে এফআইআর এবং ১ ক্যাজুয়াল ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে এফআইআর করার সুপারিশ করে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। দ্রুত এই সুপারিশ কার্যকর করে প্রয়োজনীয় রিপোর্ট কমিশনকে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় রাজ্যের মুখ্য সচিব মনোজ পন্থকে।
প্রাথমিকভাবে সেই সুপারিশকে মান্যতা না দেওয়ায়, ফের ডেডলাইন বেঁধে দিয়ে মুখ্য সচিবকে দ্রুত সুপারিশ কার্যকর করার জন্য চিঠি দেয় কমিশন। কিন্তু তারপরেও নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ সম্পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। তাই ডেডলাইনের ২৪ ঘণ্টা পেরনোর অগেই রাজ্যের মুখ্যসচিবকে বুধবার বিকেল পাঁচটায় দিল্লিতে নির্বাচন সদনে হাজিরা দেওয়ার জন্য তলব করেছে নির্বাচন কমিশন। একইসঙ্গে মুখ্য সচিবকে জানিয়ে দেওয়া হয় কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার রিপোর্ট সঙ্গে আনতে হবে।
উল্লেখযোগ্য, রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে আদর্শ আচরণবিধি চালু না থাকা সত্বেও এভাবে কেন্দ্রীয় আইন লংঘন অথবা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে অস্বীকার করার জন্য এই প্রথম রাজ্যের কোনও মুখ্যসচিবকে এভাবে তলব করল নির্বাচন কমিশন। বুধবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চের মুখোমুখি হতে হবে মনোজ পন্থকে। অর্থাৎ মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার সহ দুই নির্বাচন কমিশনারের মুখোমুখি হতে হবে মনোজ পন্থকে।
প্রাথমিকভাবে নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করা হয়েছে কি হয়নি তা জানতে চাইবে ফুল বেঞ্চ। যদি কার্যকর রিপোর্ট সঙ্গে নিয়ে দিল্লিতে পৌঁছন মুখ্য সচিব, তাহলেও তাঁকে কমিশনের সুপারিশ কার্যকরে গড়িমশির জন্য সতর্ক করতে পারে নির্বাচন কমিশন। আর যদি সুপারিশ কার্যকর না করে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন মুখ্যসচিব, সেক্ষেত্রে ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন,১৯৫০ লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করতে পারে নির্বাচন কমিশন।
প্রসঙ্গত, ভোটার তালিকা তৈরি ও তার রিভিশন এবং প্রকৃত ভোটারদের রেজিস্ট্রেশন কেন্দ্রীয় আইনের আওতাভুক্ত। রাজ্যের যে সরকারি পদাধিকারীরা ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের আওতাভুক্ত হয়ে ভোটার তালিকা তৈরির কাজে যুক্ত থাকেন, তাঁরা যদি নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কোনও কাজে গাফিলতি করেন, তাহলে সেক্ষেত্রে তদন্ত করে শাস্তির সুপারিশের এক্তিয়ার কেবলমাত্র নির্বাচন কমিশন অথবা সংশ্লিষ্ট মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের। এই ধরনের ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ করার কোনও অধিকার নেই বলে সব জানিয়েছেন কমিশনের পদস্থ আধিকারিকরা। সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসন সেই সুপারিশ কার্যকর করবেন সাংবিধানিক পরিকাঠামোয় এটাই বিধি। এমতাবস্থায় ভোটার তালিকা তৈরির কাজে কারচুপি করার অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের শাস্তিমূলক পদক্ষেপের সুপারিশকে অমান্য করে রাজ্যের মুখ্যসচিব কার্যত সাংবিধানিক দায়বদ্ধতাকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল। এমনকি কেন এ ধরনের কাজ অভিযুক্ত সরকারি আধিকারিকদের করতে হয়েছে সেই বিষয়ে কমিশন কে লেখা চিঠিতে সাফাই দিতে গিয়ে প্রকারান্তরে অভিযুক্তদের হয়েই সওয়াল করেছেন মুখ্য সচিব বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, মুখ্য সচিবের চিঠি নির্বাচন কমিশনে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই কমিশনের লিগাল সেল তা নিয়ে তৎপর হয়। এবং যাবতীয় আইনগত বিষয় ও সাংবিধানিক বিধিবদ্ধতা খতিয়ে দেখে তবেই রাজ্যের মুখ্য সচিবকে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের সদর দফতরে তলবের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সাংবিধানিক বিধি লঙ্ঘন বা কেন্দ্রীয় আইনের অমর্যাদায় নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে একজন মুখ্য সচিব যদি অনীহা প্রকট করেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে শৃঙ্খলা ভঙ্গের বিচার প্রক্রিয়া বা ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিংস চালু করার সুপারিশ করতে পারে নির্বাচন কমিশন। সেক্ষেত্রে একজন আইএএস হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মীবর্গ ও প্রশিক্ষণ বা ডিওপিটি বিভাগের মাধ্যমে শৃঙ্খলাভঙ্গে অভিযুক্ত হতে পারেন স্বয়ং রাজ্যের মুখ্যসচিব। রাজ্যের সরকারি স্তরে সর্বোচ্চ প্রশাসনিক প্রধান ও সাংবিধানিক দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখ্যসচিবের পদটি সেক্ষেত্রে কার্যত অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
এর আগে ২০২৪ সালে অন্ধ্রপ্রদেশে আদর্শ আচরণ বিধি চালু থাকার মধ্যে নির্বাচন পরবর্তী হিংসার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের সুপারিশ কার্যকর হয়নি।যার জেরে ওই রাজ্যের মুখ্য সচিব এবং ডিজিপি-কে দিল্লিতে তলব করেছিল নির্বাচন কমিশন। তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার রাজীব কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার (যার মধ্যে একজন হলেন জ্ঞানেশ কুমার, যিনি বর্তমানে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার) অন্ধ্রপ্রদেশের ওই ২ শীর্ষ সরকারি কর্তাকে তীব্র ভর্ৎসনা করা হয়েছিল। সে যাত্রায় ক্ষমা চেয়ে এবং দ্রুত সুপারিশ কার্যকর করে রক্ষা পান অন্ধ্রপ্রদেশের তৎকালীন মুখ্যসচিব ও ডিজিপি।
এমনিতেই এসআইআর প্রক্রিয়া ও বাংলা ভাষাভাষীদের সমস্যা নিয়ে রাজ্য ও নির্বাচন কমিশনের সংঘাত চরমে উঠেছে। এই আবহে রাজ্যের মুখ্য সচিবকে দিল্লির নির্বাচন সদনে তলব করার ঘটনা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল। সেক্ষেত্রে বুধবার বিকেলে মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ-এর পরিণতি কী হয় তা নিয়ে যথেষ্ট উৎসুক রাজ্য প্রশাসন।
