ডিজিটাল দুনিয়া ও কনটেন্ট ক্রিয়েশনের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেছে। আদালত জানিয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সাররা যদি বিভ্রান্তিকর, আক্রমণাত্মক বা সমাজের ক্ষতি করে এমন কনটেন্ট ছড়ান, তবে তারা আর সংবিধান প্রদত্ত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে নির্বিচারে সুরক্ষা দাবি করতে পারবেন না।
এই রায় এসেছে এমন এক সময়ে, যখন ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, মেটা ও এক্স (টুইটারের নতুন নাম)–এর মতো প্ল্যাটফর্মে প্রভাবশালী ইনফ্লুয়েন্সারদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। তারা শুধু ভোক্তাদের পছন্দ নয়, জনমত ও সামাজিক আচরণেও বড় প্রভাব ফেলছেন।
ভুয়ো তথ্য ছড়ানোয় কড়া বার্তা
আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একেবারে সীমাহীন নয়। মানহানি, অশ্লীলতা, ভুয়ো তথ্য বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার মতো কনটেন্ট-এর আওতায় সুরক্ষা পাবে না। সংবিধানের ১৯(১)(ক) ধারায় বাকস্বাধীনতা দেওয়া হলেও, ১৯(২) ধারায় যুক্তিসঙ্গত সীমাবদ্ধতাও আরোপিত আছে।
বিচারপতি পর্যবেক্ষণ করেন, সমাজে আস্থা নষ্ট করার মতো কনটেন্ট প্রচার করা গুরুতর অপরাধ। বিশেষ করে যেসব ইনফ্লুয়েন্সারের ফলোয়ার লাখের বেশি, তাদের দায়িত্ব আরও বেশি, কারণ তাদের কথার প্রভাব তাৎক্ষণিক ও বহুদূর বিস্তৃত হয়।
ইনফ্লুয়েন্সার ইকনমির উত্থান ও ঝুঁকি
ভারতে বর্তমানে কনটেন্ট ক্রিয়েটরের সংখ্যা বিস্ফোরক হারে বাড়ছে। বিজ্ঞাপন থেকে শুরু করে ব্যবসা, রাজনৈতিক মতাদর্শ, জীবনধারা প্রচার, সবকিছুতেই তারা বড় ভূমিকা রাখছেন। বিভিন্ন সমীক্ষা বলছে, আগামী কয়েক বছরে এই খাতের মূল্য হাজার হাজার কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। তবে অযাচিত প্রভাবের কারণে একাধিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
ভুয়ো তথ্য ছড়ানোর ফলে অনেক ক্ষেত্রে আর্থিক ক্ষতি, সুনাম নষ্ট হওয়া এমনকি জনঅস্থিরতাও তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে আদালত জানিয়েছে, স্বাধীন মতপ্রকাশের নামে দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের কোনও ছাড় নেই।
কঠোর নিয়ম আসার ইঙ্গিত
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায়ের ফলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের পথ খুলে গেল। ভুয়ো বিজ্ঞাপন, অনলাইন অপব্যবহার ও বিভ্রান্তিকর প্রচারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞাপন মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (ASCI) ইনফ্লুয়েন্সারদের জন্য কনটেন্ট পিছু প্রাপ্ত অর্থ প্রকাশ্যে জানানোর নিয়ম করেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই অবস্থানকে আরও আইনি শক্তি দেবে।
স্বাধীনতা ও জবাবদিহির ভারসাম্য
আদালতের বক্তব্য, এই রায় সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে না। বরং যাঁরা ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাই এর মূল লক্ষ্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো বা ক্ষতিকর বার্তা ছড়ালে ইনফ্লুয়েন্সারদের জবাবদিহি করতে হবে।
ভারতের মতো বিশাল ডিজিটাল জনসংখ্যার দেশে এই রায়কে সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর প্রভাব পড়বে শুধু ইনফ্লুয়েন্সার নয়, বরং ব্র্যান্ড, বিজ্ঞাপন সংস্থা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিতেও।

