বিশ্বদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
‘যৌনমিলন’, ‘সঙ্গম’— এ জাতীয় শব্দগুলি ভারতীয় মূল্যবোধের দাঁড়িপাল্লায় নেহাতই পলকা হলেও মিলন ব্যতীত সৃষ্টি যে অসম্ভব তা কে না জানে? আর শুধু জাগতিক সৃষ্টিই নয়, এমনকি মহাজাগতিক সৃষ্টি— অর্থাৎ এই বিপুলা ব্রহ্মাণ্ডের জন্মের নেপথ্যেও রয়েছে এক মিলন। যদিও বাস্তবের দুনিয়ায় এ ব্যখ্যা অনেকের কাছেই যুক্তিযুক্ত নাও মনে হতে পারে। কারণ, এটি কোনও যুক্তিবাদী বৈজ্ঞানিকের মুখ কিংবা কলমনিঃসৃত নয়। এই তত্ত্ব বরং খুঁজে পাওয়া যায় ভারতীয় পুরাণের পাতায়। যেখানে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে শিব-শক্তির মিলনকে।
শিব এবং শক্তি। একজন জগৎ, অন্যজন সেই জগতের সৃষ্টি আর সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণ। হ্যাঁ, ঠিক এ ভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে শাক্ত ধর্ম-নির্ভর পৌরাণিক গ্রন্থগুলিতে। যদিও সনাতন ধর্মে দেবতার যেমন অভাব নেই, তেমনিই অভাব নেই পুরাণেরও। ফলে প্রক্ষেপও বিস্তর। কিছু কিছু গ্রন্থে যেমন ভগবান শ্রী বিষ্ণুকেই উল্লেখ করা হয়েছে আদিপুরুষ হিসেবে। বলা হয়েছে, ক্ষীরোদ সাগরের জলে শায়িত অবস্থায় তাঁর নাভিপদ্ম থেকে জন্ম হয় প্রজাপতি ব্রহ্মার। যিনি বিষ্ণুর নির্দেশেই সৃষ্টির কাজের শুভারম্ভ করেন। অন্যদিকে নব্য ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে আবার বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণকেই ‘সর্বেসর্বা’র তকমা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এমনকি কোনও কোনও মতে, বিষ্ণুর থেকেও উঁচুতে তাঁর অবস্থান।
এ সবের তুলনায় শাক্তদের চিন্তাধারা অনেকাংশেই আলাদা। শাক্ত পুরাণগুলিতে বরং শিব এবং তাঁর শক্তিকে দেখানো হয়েছে একে অপরের পরিপূরক রূপে। সৃষ্টির কাজে উভয়েই অবিচ্ছেদ্য অংশ। শিবকে ছাড়া আদ্যাশক্তি মহামায়া যেমন সৃষ্টি করতে পারবেন না। তেমনিই শক্তি ব্যতীত শিবও শবের ন্যায় নির্জীব। মা কালীর মূর্তিকল্পে ঠিক এ কারণেই শিবকে দেবীর পায়ের তলায় শবের মত শায়িত অবস্থায় দেখা যায়। যাই হোক, সব মিলিয়ে শাক্ত ধর্মের মূল বক্তব্যই হল, শিব এবং শক্তির মিলন হলে তবেই হবে সৃষ্টি। নচেৎ নয়।
আর এই মিলনের রূপক হয়েই শিব-সতী কিংবা শিব-পার্বতীর একাধিক প্রেমকাহিনী বর্ণিত পৌরাণিক গ্রন্থে। তবে মিলন থাকলে থাকতে বাধ্য বিরহ-ও। সে কারণেই এই সমস্ত কাহিনিতে শক্তি একাধিকবার আলাদা হয়েছেন শিবের থেকে। এবং তার পর পুনরায় মিলিত হয়েছেন। যা কোথাও গিয়ে যেন সমর্থন করে বিজ্ঞানের বক্তব্যকেই। বিজ্ঞান বলে, শক্তি বা তার ধর্ম কখনওই বিনষ্ট বা ধ্বংস হয় না। কেবলমাত্র তার আকার বা রূপ বদলে যেতে পারে।
একইভাবে হিন্দু পুরাণে আদি পরাশক্তির দক্ষযজ্ঞের আগুনে সতীরূপে আত্মাহুতি দেওয়ার পর পার্বতীরূপে নিজের শিবের সঙ্গে পুনর্মিলিত কাহিনিও কি আসলে বিজ্ঞান-বর্ণিত শক্তি-তত্ত্বকেই ব্যক্ত করে না? যদিও এটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গ। আসল কথা হল, আলাদা হয়েও বার বার দেবাদিদেবের কাছে কেন ফিরে আসতে হয়েছে আদ্যাশক্তিকে?
আসতে হয়েছে এই কারণেই, দুয়ের মিলন ব্যতীত সৃষ্টি অসম্ভব। যা কি না শাক্ত ধর্মের মূল বক্তব্য তা আগেই বলা হয়েছে। মূলতঃ সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় চক্রের ভারসাম্য বজায় রাখতেই শক্তিকে মাঝেমধ্যে নিষ্ক্রিয় করতে হয় তাঁর শিব অর্থাৎ মহাবিশ্বকে। তখনই দুয়ের বিচ্ছেদ। যার ফলে কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েন শিব। এর পর পুনর্মিলন। ফের শুরু হয় সৃষ্টির কাজ। বৈদিক শাস্ত্র অনুযায়ী, এ ভাবেই যুগের পর যুগ ধরে কখনও মিলন, আবার কখনও বিচ্ছেদের শরিক হয়ে সৃষ্টি-চক্রের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন শিব-শক্তি। কিন্তু তাঁদের মিলন বা প্রেম— যাই বলা হোক— সেই সঙ্গে বিচ্ছেদ এতটাই উচ্চস্তরীয় যে জাগতিক প্রেম বা মিলনের সঙ্গে তুলনা করতে যাওয়া নেহাতই নির্বুদ্ধিতা।
