সন্দীপন বিশ্বাস
সেই নরম হলুদ রোদের দিনগুলো বুঝি আমরা হারিয়ে ফেলেছি! আশ্চর্য মন কেমন করা দিন! সকালে আকাশবাণীর বাঁশির শব্দে আমাদের ঘুম ভাঙত। সকাল ন’টায় সাইরেনের শব্দে ঘড়ি মিলিয়ে নেওয়া, রবিবারের দুপুরের অনুরোধের আসরের সেই মনমাতানো গান, রাত সাড়ে ন’টায় ছায়াছবির গান। শুক্রবারে রাত আটটায় বেতার নাটক। তার সঙ্গে ছিল, বাজারের উত্তাপ, রাজনৈতিক ডামাডোল। ছিল চীনের আক্রমণ, পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন, ছিল নকশালদের বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা এবং দিনবদলের স্বপ্ন। এই সব কিছুর মধ্যে বাঙালি জীবন পেয়েছিল এক পূর্ণতা। অভাবের মধ্যেও বাঙালি খুঁজে পেত প্রাপ্তির আনন্দ। বাঙালির ছিল এক নিজস্ব জীবনদর্শন। এক নিজস্ব সংস্কৃতি. আজকের মতো পাঁচফোড়ন সংস্কৃতির গড্ডালিকায় গা ভাসিয়ে দিতে চায়নি। নাটক, সিনেমা, সঙ্গীত, নৃত্যের নিজস্ব জগৎ ছিল তার।
সেই সময় বাঙালির নিজস্ব অনেক আইকন ছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম সেরা ছিলেন উত্তমকুমার। তিনি ছিলেন এক স্বপ্নের ব্যক্তিত্ব। দূর গ্রহের অধরা স্বপ্নের পুরুষ হলেও তিনি ছিলেন যেন প্রতিটি পরিবারেরই সদস্য। নিত্যদিন তাঁকে নিয়ে চলত আলোচনা। কলকাতার দুপুরের কমলা রোদে মহিলারা দল বেঁধে দুপুরের খাওয়া সেরে মুখে পানের খিলি দিয়ে ম্যাটিনি শো দেখতে যেতেন। কলেজের ছেলেরা ক্লাস কেটে পঁয়ষট্টি পয়সার টিকিটের লাইনে দাঁড়াতেন। বড় বড় পোস্টারে উত্তমকুমার আর সুচিত্রার মুখ। কখনও ছবির নাম ‘পথে হল দেরি’, ‘সবার উপরে’, ‘সাগরিকা’ অথবা ‘গৃহদাহ’।
‘উত্তমকুমারের ছবি’ বলতে মেয়েরা তখন পাগল। পর্দায় প্রথম উত্তমকুমারের উপস্থিতি মানেই বহু মেয়ের বুকের ভেতর এক ঝাঁক পায়রা উড়ে যাওয়া। অ্যাড্রিনালিন গ্রন্থিতে ছলকে উঠত রক্ত। তাঁদের বইয়ের পাতায় কিংবা গানের খাতার ভিতরে থাকত খবরের কাগজ থেকে কাটা উত্তমকুমারের ছবি। পরিযায়ী সময় নিউজপ্রিন্টে ছাপা ছবিকে আজ বিবর্ণ করে দিয়েছে কিংবা সেই ছবি কোথায় হারিয়ে গিয়েছে, কে তার খোঁজ রাখে। সেই মানুষটিও বিদায় নিয়েছেন কতদিন হয়ে গেল। কিন্তু বিবর্ণ হয়নি তাঁর জনপ্রিয়তা, বিবর্ণ হয়নি তাঁর গ্ল্যামার, বিবর্ণ হয়নি সেলুলয়েডের ফ্রেম টু ফ্রেম ধরে রাখা তাঁর অভিনয়। যেন ফ্রেমবাঁধানো প্রেম। আজও যেন তাঁকে পর্দায় দেখলে বাঙালি অন্তর গেয়ে ওঠে, ‘আমার পরাণ যাহা চায় তুমি তাই, তুমি তাই গো!’ অন্তত তিনটে প্রজন্ম তাঁকে ঘিরে এমনই অবসেসড হয়ে আছে।
আসলে এক অদৃশ্য চৌম্বক শক্তি ছিল তাঁর মধ্যে। কী অসাধারণ তাঁর সম্মোহন শক্তি! সেটা কেউ বলেন তাঁর ব্যক্তিত্ব, কেউ বলেন রূপ, কেউ বলেন তাঁর হাসির টান, কেউ বলেন কী গভীর প্রেমের দৃষ্টি, আবার কেউবা বলেন অমন অসাধারণ অভিনয় করতে কাউকে দেখিনি। আসলে উত্তমকুমার হলেন এই সমস্ত কিছুর নিরিখে বাঁধা একজন পুরুষ। এক সম্মোহন বৃত্ত, যাঁকে দেখে দেখে আঁখি না ফেরে।
অবাক করা ব্যাপার হল, সাধারণ দর্শকদের থেকে উত্তমকুমার ছিলেন অনেক দূর গ্রহের এক তারকা। তা সত্ত্বেও আবেগের কাছে মুছে যেত বাধা সম্পর্কিত যাবতীয় বাস্তবতা। তাঁর সম্পর্কে দর্শকদের কমবেশি এক প্রেমের অনুভূতি জাগত। মনে হতো, নাই বা পেলাম কাছে। তবু তিনি আমার আত্মার আত্মীয়। আমার ঘরেরই বোধহয় এক সদস্য। প্রতিনিয়ত তাঁকে নিয়ে তাঁর অভিননয় নিয়ে তাঁর রোমান্টিক ইমেজ নিয়ে বাঙালি আলোচনায় মশগুল থাকত। উচ্চবিত্তের ড্রয়িং রুম, বস্তির ছাদ ছুঁইয়ে জল পড়া ঘর, কলেজ ক্যান্টিন, পাড়ার রোয়াক অথবা সাট্টার ঠেক, সর্বত্রই বিরাজমান উত্তমকুমার।
তাই সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক প্রেমের দেবতা। সেলুলয়েডে বাঙালি সম্ভবত এমন কন্দর্পদেবকে আগে কিংবা পরে অনুভব করেনি। ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবির সেই দৃশ্যটা তো সুপার হিট! সেই যে দৃশ্যে চিন্ময় রায় তাঁর প্রেমিকা শিবানী বসুকে বলছেন, ‘তুমি একবার আমাকে বল না উত্তমকুমার।’ এই আকুতি ছিল তখনকার প্রতিটি পুরুষের মধ্যে। তাঁরা প্রত্যেকেই প্রেমিক হিসাবে উত্তমকুমার হয়ে উঠতে চাইতেন। ঠিক উল্টোদিক থেকে দেখলে আমরা দেখি বহু মেয়েই তাঁর প্রেমিক বা স্বামীর মধ্যে উত্তমকুমারকে খুঁজতেন। আমাদের চেনা জীবন, পারিপার্শ্বিক চলমান পরিবেশ, অন্দরমহল সর্বত্রই বাঙালি তাঁকে খুঁজত। কী খুঁজত তারা? বাঙালি মেয়েরা চাইতেন মূলত এমন একজন ব্যক্তিত্ববান, দায়িত্বশীল, কিছুটা উদাসীন এবং রোমান্টিক এক পুরুষ, যাঁর আদল উত্তমকুমারের মতো। ছবিতে যেভাবে তাঁকে তৈরি করা হয়েছে, সে এক আদর্শ পুরুষ। স্মার্ট, সুশ্রী, রুচিশীল, সহানুভূতিশীল, সহমর্মী, সৃজনশীল, উদার দৃষ্টিভঙ্গীসম্পন্ন, বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ ইত্যাদি গুণগুলি সাধারণ দর্শকদের কাছে তাঁকে এক আদর্শ পুরুষ হিসাবে সৃষ্টি করেছে।
পর্দার উত্তমকুমারের কোথায় অনন্যতা? সেটা কি শুধুই গ্ল্যামার? ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই মাপের গ্ল্যামার ক’জনের ছিল, তা বিচার করা অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু উত্তমকুমারের চোখের দৃষ্টিতে কিংবা হাসিতে ঝরে পড়ছে প্রেমের চোরাটান। তার টানে আকৃষ্ট হননি, এমন মহিলা বোধহয় ছিলেন না। মা-ও উত্তম বলতে পাগল, মেয়েও উত্তমের জন্য একেবারে অন্ধ! এমনটি কি এর আগে কখনও দেখা গিয়েছে?
কেন এই উত্তম-ম্যাজিক! কেন তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রেমের কেষ্ট ঠাকুর? সেটাকে বিচার করার জন্য তাঁর প্রতিটি ছবির বিচার করা দরকার। প্রতিটি ছবি জুড়েই তাঁর প্রেমের অনন্য বিন্যাস। মুগ্ধতার রেশ আজও কাটেনি। এক শাশ্বত প্রেমের প্রতীক হয়ে তিনি রয়ে গিয়েছেন মৃত্যুর এতদিন পরেও। উত্তমকুমারের প্রতিটি ছবি বিশ্লেষণ করলে প্রেমের একটা স্বতস্ফূর্ত প্রাপ্তি, ভালোবাসার নিটোল বাঙালি ঘরানা উঠে আসে। মধ্যবিত্ত প্রেমের এই ভিন্ন ডায়মেনশনটাকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এক একটা ছবিতে তাঁর প্রেমের এক একটা শেড। তাঁর ছবির অন্যতম উপাদান রোমান্স। ভালোবাসার চালচিত্রের মতো সারা ছবিতে তা ছড়িয়ে থাকত। সেই রোমান্সের মূল শক্তি যদি হয় তাঁর অভিনয়, তাহলে অন্যটি ছিল তাঁর হাসি ও গ্ল্যামার। একবার জহর রায় মজা করে বলেছিলেন, ‘অমন ভুবনমোহিনী হাসি দেখলে মেয়েরা প্রেমে পড়বেই। আমি তো পুরুষ হয়েও প্রেমে পড়েছি।’ কথাটা শুধু কৌতুক বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। তাঁর রোমান্স ও প্রেম, তাঁর অভিনয় ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ ছিলেন পুরুষ দর্শকরাও। তাঁরাও প্রেমিক হিসাবে উত্তমকুমার হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন।
তাঁর ছবিতে শুধু প্রেম বললে হয়তো সবটা বলা হয় না। কেননা সব ছবিতে তাঁর প্রেমের প্রকাশ এক নয়। বিভিন্ন ছবিতে প্রেমের বিভিন্ন সত্তা ও স্তরকে তিনি ধীরে ধীরে নানা রূপে উন্মোচিত করেছেন। সারা জীবনে তিনি ৪৬ জন নায়িকার বিপরীতে অভিনয় করেছেন। এক এক করে বিচার করলে দেখা যাবে। এক একজন নায়িকার সঙ্গে তাঁর অনস্ক্রিন প্রেমের বন্ডিংটা এক এক রকম। আবার ছবি হিসাবে, গল্পের দাবি হিসাবে প্রেমের সূক্ষ্ম ফারাকটাকে কী মহাকাব্যিক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।
উত্তমকুমারের এই যে একচ্ছত্রভাবে কিং অব রোমান্স হয়ে ওঠা, এর পিছনে কারণ কী? শুধুই দর্শনধারী, শুধুই অভিনয়, নাকি আরও অন্যকিছু! যা কেবল অনুভব করা যায়, উপলব্ধি করা যায়! উত্তমকুমারের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যদি তাঁর রূপ বলে মনে করা যায়, তাহলে সেটা মস্ত ভুল হবে। কী অন্তরঙ্গে , কী বহিরঙ্গে, তিনি ছিলেন অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক পুরুষ। সেই আকর্ষণকে আরও গভীরতর করে তুলেছিল তাঁর অভিনয়। তিনি এসে বাংলা ছবির প্রেমের আবহটাকেই একেবারে বদলে দিলেন। উত্তমকুমার যুগের আগে প্রমথেশ বডুয়া এবং কানন দেবীর যুগের ছবিতে প্রেম মানে ছিল স্টুডিও গাছের ডাল ধরে দোল খাওয়া, পুকুরে জলে চাঁদের আলো আর দু’কলি গান, ‘কে রং লাগাল বনে বনে’।
অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রমথেশ বড়ুয়া ও কাননদেবীর জুটি ছিল সুপার ডুপার হিট। ‘মুক্তি’র জোয়ারে ভেসে যাওয়া সেই জুটির পরে উত্তমকুমার এবং সুচিত্রা সেনের জুটির প্রতিষ্ঠা। যত দিন গিয়েছে, ততই তাঁরা অনিবার্য জুটি হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। প্রেমকে প্রথম বাংলা ছবিতে এই জুটি নিয়ে এল মানবীয় সত্তায়। প্রেম উঠে এল চলন্ত বাইকের ছন্দোময় গতিতে। সেই গতির সঙ্গে মিশে গেল সুর। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলতো, তুমি বলো।’ বাইকে উত্তম-সুচিত্রা, ব্যাকগ্রাউন্ডে হেমন্ত-সন্ধ্যা। আমাদের ভালো লাগা আবেগকে যেন কোন অধরা সুদূর স্বপ্নের দেশে তা উড়িয়ে নিয়ে যায়। এক অধরা কল্পনার জগৎ, যেন এক রূপকথার জগৎও। আমাদের ভালোলাগাকে আরও উস্কে দিয়ে যায় সাহসী, সাবালক চিত্রায়ন। উত্তমকুমারের বাইকের পিছনে তাঁকে আঁকড়ে ধরে বসে আছেন প্রেমিকা সুচিত্রা সেন। এখনকার দর্শকদের ভাবা মোটেই সম্ভব নয়, কী দুঃসাহসী ছিল অজয় করের সেই চিত্রায়ন। কী সামাজিক দিক থেকে, কী টেকনিক্যাল দিক থেকে! গানের সঙ্গে, বাইকের গতির তালে দু’জনের শরীর পরস্পরকে হাল্কাভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রিত, পরিশীলিত অনুচ্চারিত যৌনতা আমাদের অজান্তেই আমাদের ভিতরে ভালোলাগার রেণু ছড়িয়ে দিয়ে যায়। দর্শক তখন নিজেই যেন প্রেমিকা হয়ে ওঠেন। তাঁর মন যেন বলে ওঠে, ‘তুমি রবে নীরবে, হৃদয়ে মম।’
‘শঙ্খবেলা’ ছবিতে নৌকার উপরে পাশাপাশি শুয়ে ক্লোজ শটে ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ গানটি কি সত্যিই অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে নিঃশব্দে লিবিডো সঞ্চার করে না? যেন অতর্কিতে মগজে হাইপোথ্যালামাস এবং ডোপামিনের নিঃসরণ ঘটে যায় নিঃশব্দে।
কিন্তু একটা বিষয় মনে রাখা দরকার। সেটা হল উত্তমকুমারের সমস্ত ছবি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তাঁর প্রেমের মূলে কোথাও যৌনতা নেই। হয়তো সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে। কিন্তু তৎকালীন মধ্যবিত্ত জীবনে রোমান্সের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক খুব গভীর ছিল না। যৌথ পরিবারের সকলে মিলে একসঙ্গে সিনেমা দেখার রেওয়াজ চালু ছিল, তাই প্রেম করলে প্রেমিকার হাত ধরতেই তিন রিল খরচ হয়ে যেত। তাই এইসব ছবির প্রেমের দম ছিল তার সংলাপে ও অভিনয়ে। কী অসাধারণ সব সংলাপ। কবিতা অনুরাগী বাঙালি ছেলেদের খুব প্রিয় ছিল সেইসব সংলাপ বা ছবির গান। এইসব গান ও সংলাপ ব্যবহার করে বাঙালি ছেলেরা কাঁপা কাঁপা হাতে ভীরু ভীরু আখরে প্রেমপত্র লিখত।
উত্তমকুমার তাই ছিলেন বাঙালির কাছে এক আদর্শ পুরুষের মতো। তিনি ধুতি, পাঞ্জাবিতেই প্রেমের বিশ্ব জয় করতে পারেন। তাই তাঁর রোমান্স কখনওই তথাকথিত যৌনতার কাছে আত্মসমর্পণ করে না। যৌনতা মানে অবশ্য যৌনদৃশ্য নয়। যৌনতার ইঙ্গিতকে বোঝানো হচ্ছে। তারও কোনও সস্তা পথ তাঁকে ধরতে হয়নি। তবুও দুই সুন্দর অনুভবী সত্তার প্রেম এসেন্সের মতো ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদের মধ্যে। আমাদের ভিতরেও সুন্দরবোধকে, আদর্শ এক প্রেমসত্তাকে জাগিয়ে তোলে। আমাদের প্রেমিক ও প্রেমিকা হতে সাহসী করে তোলে।
প্রেমের এমন বহুমুখী নির্যাসে ভরপুর হয়ে আছে তার প্রতিটি ছবি। তবে একটাই কথা এমন প্রেমিক পুরুষ বারবার ব্যক্তিগত জীবনে যন্ত্রণা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন। পরিবারের কাছ থেকে, ইন্ডাস্ট্রির কাছ থেকে তিনি পেয়েছেন বহু আঘাত। কিন্তু সেই দুঃখ ছিল অন্তঃসলিলার মতো। সেই কষ্টকে তিনি বাইরে কখনও আনেননি। সেই আঘাতে নিজের সৃষ্টিকে নষ্ট হতে দেননি। কেননা তিনি জানতেন, তিনি নিজেই একজন বিনোদনের ফেরিওয়ালা। সবাইকে বিনোদন বিলিয়েই গিয়েছেন। ‘নায়ক’ ছবির অরিন্দম হয়েই তিনি বাস্তবে বেঁচে ছিলেন। নিজের যন্ত্রণা ইন্ডাস্ট্রির ঈর্ষার ঢেকুর উড়িয়ে দিয়ে তিনি যেন অরিন্দমের মতোই বলেছেন, ‘আই উইল বি দ্য টপ অ্যান্ড টপ অ্যান্ড টপ’। এই ছবিতে যেন উত্তমকুমার
এবং অরিন্দম একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। এভাবেই বহু যুগ পেরিয়ে জন্ম নেন একজন মহানায়ক।
বিভিন্ন ছবিতে তাঁর গানের অংশগুলি জুড়ে কুয়াশার মতো জড়িয়ে আছে একরাশ রোমান্টিসিজম। শুধু গানের নিখুঁত লিপ দেওয়াই নয়, সেই সব গানের কথা ও মেজাজের সঙ্গে তাঁর যে অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে, তা আগে কখনও দেখা যায়নি। বাংলা ছবিতে এভাবে বহু ব্যাপারে তিনি পথিকৃৎ হয়ে আছেন। ‘ইন্দ্রাণী’ ছবির ‘নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড়’ গানটি সুপার হিট এই গানের উত্তম কুমারের প্রোফাইলটা আমাদের চমকে দেয়। ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে আমরা এক অনিবার্য লিবিডোর স্রোতে ভেসে যাই কিংবা ‘চৌরঙ্গী’র ‘মেঘের খেলা আকাশ পারে’ গানের চিত্রায়ন দেখতে দেখতে আমাদের বুকেও মেঘ জমে। এক নিঃসঙ্গতার ছায়া সরণি জুড়ে পড়ে থাকে মহানায়কের শাশ্বত অস্তিত্ব-চিহ্ন। আবার ‘সাগরিকা’র ‘আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে’ গানটি আমাদের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক স্বপ্নের নায়িকার মুখকে উজ্জ্বল করে তোলে।
‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’র ‘আমি যামিনী তুমি শশী হে’ গানের মধ্যে যেন জীবনের সমস্ত সুধারসকে এক অঞ্জলিতে ধরে ফেলা যায়। ‘দেয়া নেয়া’র ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন আর ওই চোখে সাগরের নীল’ গানটি যেন আমাদের উজ্জ্বল এক সমুদ্র তরঙ্গের মাথায় সাম্পানে ভেসে যাওয়ার আনন্দকে মনে করিয়ে দেয়। এসব গান একটা যুগের প্রেমের আইকন হয়ে থাকে? যুগ হারিয়ে যায়, কিন্তু গানগুলি ইতিহাস ও সময়ের এক একটা মাইলস্টোন হয়ে থাকে। যেগুলি আমাদের মুগ্ধতাকে এক অনিঃশেষ অনুভবে ভরিয়ে তোলে। এই প্রেম, এই জনপ্রিয়তা আমাদের মধ্যে এক শাশ্বত অভিবাসনা তৈরি করে। সেই বাসনা আমাদের ক্রমান্বয়ে চুম্বকের মতো টানতেই থাকে। সেই টানেই তাঁর অন্তহীন অভিযাত্রা।
আজ এক বিশেষ দিন। তিনি শতবর্ষে পদার্পণ করলেন। আজও আমাদের মন তাঁর দিকে তাকিয়ে গেয়ে ওঠে, ‘আমি তোমার বিরহে রহিব বিলীন, তোমাতে করিব বাস, / দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী, দীর্ঘ বরষ মাস।’
