উৎসবের মরসুমে চেনা কলকাতা ধরা দেয় মোহময়ী রূপে। অস্থায়ী তোরণের সাজসজ্জা, রং-বেরঙের বাহারি আলো, বড় বড় ব্যানার, দৃষ্টি কেড়ে নেয় বহু দূর থেকে। ব্যস্ত রাস্তায় তৈরি এই সমস্ত অস্থায়ী তোরণ থেকে উঠে আসে বড় অঙ্কের টাকাও। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে পাওয়া সেই অর্থ, উৎসব কমিটির দুশ্চিন্তা কমায়। কারণ দৈনন্দিনের বিপুল খরচ সামাল দেওয়া সম্ভব হয় বলেই।
বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজোতেও বড় বেশি করে ধরা পড়ে এমন ফ্রেমবন্দি ছবি। রাজ্য সরকার বছর বছর যতই পুজো অনুদানের পরিমাণ বাড়াক, সর্বজনীন পুজো উদ্যোক্তাদের বড় ভরসার জায়গা হল মণ্ডপের আসা-যাওয়ার পথে বড় বড় অস্থায়ী তোরণ। যত বেশি বিজ্ঞাপন দেওয়ার জায়গা তৈরি হবে, তত বেশি টাকা উঠে আসবে উৎসবের খরচ মেটাতে।
উৎসব বা দুর্গাপুজো ঘিরে এমন সদর্থক ভাবনার নেপথ্যে রয়েছে চিরায়ত দৃশ্য সংস্কৃতি। মাতৃ আরাধনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশও এগুলি। কারণ উৎসবমুখর পরিবেশকে আরও জাঁকজমক করে তোলে তার তোরণদ্বারগুলি। ব্যবসায়ীরাও খুব সহজেই ব্যানার কিংবা ফেস্টুনের মাধ্যমে তাঁদের পণ্যসামগ্রী তুলে ধরতে পারেন লাখো লাখো জনগণের দরবারে।
সদর্থক এই দিকগুলির পাশাপাশি রয়েছে ক্ষতিকর দিকগুলিও। বড় বড় গেট বা তোরণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটা বড়সড় ঝুঁকি। তাছাড়া অনেকটা জায়গা দখল করে থাকায় রাস্তায় যেমন যানজট তৈরি হয়, তেমনি পথচারী এবং গাড়ি চালকদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটিয়ে বাড়িয়েছে দুর্ঘটনার সংখ্যা। রংচঙে কাপড়ে মোড়া বিশাল বিশাল তোরণে বাধা পায় গাড়িচালকদের দৃষ্টিসীমা। আগাম দেখাও সম্ভব হয় না আশপাশের গলি থেকে বেরিয়ে আসা স্কুটার-বাইক কিংবা চারচাকার প্রাইভেট কারকে।
ফুটপাথ জুড়ে হকার কিংবা ফুড বা সফট ড্রিঙ্কসের স্টল উৎসবের অন্যতম অঙ্গ। তাই গাড়ি চলাচলের রাস্তায় নেমে পড়তে হয় আনন্দ উৎসবে সামিল হতে চাওয়া পথচারীদের। এর ফলে একদিকে যেমন যানজটের ঝুঁকি বাড়ে, তেমনি দুর্ঘটনাও ঘটে আকছার। তাছাড়া পরিবেশের দিক থেকেও প্রভাব ফেলে উৎসবের তোরণ। এই সময়েই নির্বিচারে কেটে ফেলা হয় গাছের ডালপালা, বিজ্ঞাপনদাতাদের পণ্যসামগ্রী যাতে সহজেই চোখে পড়ে। গাছের পাতা কিংবা ডাল যেন সেগুলিকে না ঢাকে। এতে দূষণের পরিমাণ যেমন বেড়ে চলে, তেমনি সঙ্কটে পড়ে কীট-পতঙ্গ সহ বন্যপ্রাণও।
বড় বড় তোরণের জন্য কাজের চাপ বাড়ে ট্রাফিক পুলিশের। তাছাড়া ফি বছরই পুজো কিংবা অন্য কোনও উৎসব শেষ হলেও তোরণ কিন্তু রয়ে যায় আরও দিন পনেরো-কুড়ি। জনস্বার্থেই অস্থায়ী কাঠামোগুলি সরানো নিয়ে কলকাতা পুরসভা এবার কড়া পদক্ষেপও করেছে। জানানো হয়েছে, দু সপ্তাহের মধ্যেই যাবতীয় পরিকাঠামো না সরানো হলে আইন মাফিক পদক্ষেপ করা হবে। আর পুরসভাকে হাত লাগালে দিতে হবে অর্থদণ্ড।
