স্নিগ্ধা চৌধুরী, ক্ষীরগ্রাম
শারদপ্রাতের কাশফুলের কোমল সুবাস যখন বাতাসে মিশে যায়, তখন কেবল প্রকৃতির অঙ্গনে নয়, সমগ্র বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে জাগ্রত হয় এক অপূর্ব শক্তির আহ্বান। আশ্বিন মাসের অমৃত সকাল থেকে গগনমণ্ডল যেন এক মহাজ্যোতির্ময়ী দীপে আলোকিত হতে থাকে। বাংলার হৃদয়ে এক বিশাল উৎসবের সুর বেজে ওঠে। তবে এই মহোৎসবের অন্যতম গৌরবময় স্থান বর্ধমান জেলার মঙ্গলকোট থানার ক্ষীরগ্রাম, যেখানে প্রাচীন যুগের এক ঐতিহাসিক কাহিনি আজও বুকে ধারণ করে চলেছে এক মহা গোপন রহস্য।
পুরাণমতে, সতীপীঠগুলি সেই পবিত্র স্থান যেখানে দেবী সতীর শরীরের অংশ পৃথিবীতে পতিত হয়েছিল। ত্রেতা যুগে রাবণের প্রভুত্বকালে, তিনি মহামায়া দেবীকে নিজের বিশেষ প্রিয় অর্চ্য দেবতা মনে করতেন। জনশ্রুতি, মহাযুদ্ধের সময় রাবণ পরাজিত হলে হনুমান মায়ের মূর্তিটিকে নিজ কাঁধে তুলে বিশেষ সুড়ঙ্গপথ পেরিয়ে এই পবিত্র ক্ষীরগ্রামে নিয়ে এসে স্থাপন করেন। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক অতীন্দ্রিয় ঘটনা, যা আজও এই পীঠের ভক্তদের মনের আস্থায় অটুটভাবে প্রবাহিত।
ক্ষীরগ্রাম সতীপীঠ হিসেবে বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। এখানে মৃন্ময়ী দুর্গা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না। কারণ বিশ্বাস করা হয়, দেবী যোগাদ্যা দশভুজা রূপে সরাসরি এই পবিত্র ভূমিতে অবিরত অবস্থান করছেন। মন্দির কমিটির সদস্যরা বলেন, ডান পায়ের বুড়ো আঙুল পতিত হওয়ার স্মৃতি আমাদের এই পীঠের বিশেষত্ব। এই পবিত্র স্থানে দেবীর মূর্তি নিয়ে আসা নিষিদ্ধ। আমরা মা যোগাদ্যা রূপেই পুজো করি, কলাবউ ও নবপত্রিকার মাধ্যমে।
প্রতিবছর মহাসপ্তমীর দিন ক্ষীরদিঘির জলে নবপত্রিকার স্নান অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তগণ ভিড় জমিয়ে প্রাচীন তন্ত্রমন্ত্র অনুসারে মা যোগাদ্যার পবিত্র অভিষেক সাধন করেন। কলাবউ পুজোর সাথে অদ্ভুত আধ্যাত্মিক অনুভূতির মিল। সন্ধিক্ষণের প্রতিটি ক্ষণ যেন এক রহস্যময় জ্যোতির্ময়ী শক্তির প্রকাশ। পাঠা ও মহিষ বলির রীতি অনুযায়ী দেবীর প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন হয়। অষ্টমীর দিন গোটা গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে ঢাকের গম্ভীর তালে মা বলে চিৎকার করেন, যেন স্বয়ং দেবী নিজে উপস্থিত হয়ে আশীর্বাদ করছেন।
সংক্রান্তির দিন বিশেষভাবে ভোগ রান্না হয় না। কারণ এই দিন দেবী শোকাহত থাকেন রাবণের পরাজয়ের স্মৃতিতে। সেই দিনে মা নিজেই নিজস্ব উপোসে থাকেন। অন্যদিন মা জগদ্ধাত্রী রূপে ভোগ গ্রহণ করেন। এই নিয়ম বহু প্রাচীন কালের কালজয়ী প্রথা হয়ে এসেছে, যা গ্রামবাসী আত্মার গভীরতা থেকে পালন করে আসছে।
দুর্গাপুজোর দিনগুলোতে ক্ষীরগ্রাম যেন এক জ্যোতির্ময়ী শক্তির কেন্দ্রে পরিণত হয়। মহাসপ্তমী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত প্রতিটি দিন ঐতিহ্যগত মন্ত্রপাঠ ও তন্ত্র সাধনার মাধ্যমে পূর্ণ হয়। বিজয়া দশমীতে গ্রামের সকল মানুষ মা যোগাদ্যার আশীর্বাদ নিয়ে বয়স্কদের পা স্পর্শ করে নিজের জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধির আশার বীজ বপন করেন। দেবী সতীর ৫১টি পীঠের মধ্যে ক্ষীরগ্রাম অন্যতম পীঠস্থান হওয়ায় এই পুজোর মাহাত্ম্য অনন্য। এখানে শুধুমাত্র আচার পূরণ হয় না, বরং দেবীর জীবন্ত শক্তির স্পর্শ অনুভূত হয়।
এই পুজোৎসবের মাহাত্ম্য কেবলমাত্র আচার-অনুষ্ঠান নয়, এটি প্রাচীন জ্ঞানের সংরক্ষণ, শক্তি সাধনার উন্মেষ। ক্ষীরগ্রাম যেখানে যুগ যুগ ধরে এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। মৃন্ময়ী প্রতিমা না থাকলেও, মা যোগাদ্যার উপস্থিতি যেন এক অদৃশ্য দীপ্তির মতো প্রতিনিয়ত প্রতিটি হৃদয়ে জ্বলজ্বলে আলো ছড়িয়ে দেয়। এই পুজো শুধু কালিদাসের কাব্যে বর্ণিত নয়, বরং জীবন্ত বাস্তবে প্রতিটি বিশ্বাসী আত্মার সঙ্গে মিলেমিশে তাদের জীবনে অনন্ত আনন্দ ও শক্তির আশীর্বাদ হয়ে বিরাজমান।
