আমেরিকা থেকে শুভঙ্কর মুখোপাধ্যায়
যেন পাড়ার ‘গো অ্যাজ ইউ লাইক’ কম্পিটিশন। সেটাই প্রবাসে হপ্তান্তের পুজোর শিরোনাম। দেশের পুজোর কাছাকাছি আগে পরের কোনো একটা সপ্তাহান্তেই পুজো পরবাসে। উদ্যোক্তাদের সুযোগসুবিধা কিংবা আয়োজনের পরিকাঠামোর সঙ্গে মানানসই কোনো একটা সময়ে। মন্দিরে বা হাইস্কুলে বা কোনো প্রেক্ষাগৃহের মণ্ডপ বা প্যান্ডেলে। বিস্যুতবারের বারবেলায় প্রবাসী পঞ্চমী, আদতে ডেকেরেশন ডে। মেগা শো শুক্রবার বিকেল থেকে। রবিবারে দুঃখের দশমী। পরবাসী পুজোর কোনও তিথিনক্ষত্র নেই, গুপ্ত প্রেস বনাম বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত নেই। ওই যে, প্রবাসে নিয়ম নাস্তি!
আমার কেমন যেন পুতুলখেলার মতো লাগে। হর্ষ আছে, মনমেলান্তি আছে, সাজগোজ আছে। খেলাশেষে আবার সব গুটিয়ে ফেলা আছে। কিন্তু সবই যেন কেমন মিছিমিছি। আমাদের বিদেশের পুজোটা যেন তেমনই। আচার অনুষ্ঠান পুজোপাট প্রসাদ প্রসন্নতা, সব আছে। কিন্তু আমাদের পুজোটার সবই অনেকটা দেশের মতো। কিন্তু দেশের পুজো তো নয়! যদিও যা নেই, তা তো স্মৃতি হয়েই থাকে। ভিনদেশি পুজোয় আমরা যেন ফিরে পাই একটা পুরনো অ্যালবাম। আর কিছু সিপিয়া রংয়ের ছবি। আমার মেয়েকে ওর মা শাড়ি পরিয়ে দেয়। মনে পড়ে, আমার মা-ও এভাবে শাড়ি পরিয়ে দিতো আমার দিদিকে। আমাদের পুজোয় একান্তে একটু ঘনিষ্ঠ হয় সবে দেশ থেকে আমেরিকায় পড়তে আসা তরুণ তরুণী। মনে পড়ে সেই মেয়েটির কথা, অষ্টমীর সকালে যে আমাকে নীল রংয়ের অপরাজিতা ফুল দিয়েছিল সংগোপনে। ইতিহাসের ছদ্মবেশে এই অতীতের আয়নাই আমাদের পুজো পরভূমে।
দুর্গাদেবীর এমন ‘মার্কিনরূপেন সংস্থিতা’র পুজো নয় নয় করে পাঁচটি দশক পেরিয়ে গেছে, যার ঐতিহাসিক শুরুয়াৎ ১৯৬৫ সালে। আমেরিকার অভিবাসন গবেষণা সংস্থা ইস্ট ওয়েস্ট সেন্টারের গ্রন্থাগার থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শিক্ষামূলক গবেষণা, চিকিৎসা, প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি মেধা ও দক্ষতা আমদানির জন্য আমেরিকায় সে বছরই চালু হয়েছিল ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’। সেই সুবাদেই ১৯৬৮ নাগাদ অভিবাসীদের ঢল নামে মার্কিন মুলুকে। আশ্চর্যজনক ভাবে, সেই ভিড়ের ৯ শতাংশই ছিল হিন্দু বাঙালি, ভারতীয় বাংলাদেশি মিলিয়ে। আর কে না জানে, পরিযায়ী বাঙালির তল্পিতল্পায় তিনটি জিনিস থাকেই: আড্ডা, খাওয়াদাওয়া আর দুর্গাপুজো।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুয়ায়ী, মার্কিন প্রবাসী বাঙালিদের উদ্যোগে প্রথম দুর্গাপুজো হয় ১৯৬৯ সালে, ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের লস এন্জেলেসে। সেটা অবশ্য ছিল প্রতিমাহীন ছবিপুজো। এই মডেল অনুসরণ করে পরের বছরই জাহাজে করে কুমোরটুলি থেকে আনানো সোলার দেবীমূর্তির পুজো হয় ইলিনয় প্রদেশের শিকাগোয়। এর বছর চার পাঁচ পর থেকে আমেরিকায় রীতিমতো সংগঠন গড়ে দুর্গোৎসব শুরু হয়। এক্ষেত্রে অগ্রণী মেরিল্যান্ডের ‘সংস্কৃতি’ এবং নিউ জার্সির ‘কল্লোল’। যদিও সেই শুরু থেকেই মার্কিন শারদোৎসব কার্যত দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো। এখনও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে।
দেশের প্রতিমায় মাটির গন্ধ থাকে, কুমোরপাড়ার রং থাকে। দেশের পুজোর ভিড়ে হিম থাকে, ভূলুন্ঠিত শিউলির শরীরে শিশির থাকে। আমার মা বলতো, শিশির হলো নক্ষত্রের অশ্রুজল! প্রবাসের পুজোয় প্যাঁটরায় মোড়া সাত পুরনো ‘ঠাকুর’ । বাক্স খুললেই সপরিবারে মা দুগগা। কয়েক বছর পর পর এই পুরনো মূর্তি অন্য কোনো সংস্থাকে বেচে দিয়ে ‘নতুন মায়ের সংসার’। প্রবাসে পুজোয় আপনজন বলতে অ্যামাজন! তার কল্যাণেই পৈতে থেকে ‘পুরোহিত দর্পণ’, নীলকমল থেকে কলাবউ! প্রবাসে তাই একটা জগাখিচুড়ি ‘থিম পুজো’ ভাব। একটু বাড়ির পুজো,একটু বারোয়ারি।
প্রবাসী পুজোয় খিচুড়িভোগ আছে। কিন্তু কমিউনিটি কিচেন, নো রান্নার ঠাকুর! বিজয়ার মিষ্টি বলতে হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালা কিংবা বড়জোর ইম্পোরটেড ফ্রম বাংলাদেশ। প্রবাসের পুজোয় মাটির প্রদীপ নেই, ফায়ার সেফটি। অগত্যা ব্যাটারি চালিত টুনি বাল্ব জ্বালিয়ে খেলনা প্রদীপ। ধুনুচি নাচ আছে, কিন্তু সেই জ্বলন্ত নারকেলের ছোবড়া নেই, ধোঁয়ার উৎস ড্রাই আইস! ইউ টিউবে ঢাকের বাদ্যি আছে, এমনকি সত্যিকারের ঢাকও আছে। কিন্তু ঢাকির কাঁধের ঝোলানো ঢাকে পাখির পালকের সেই উষ্ণীষ নেই! প্রবাসের পুজোয় কাঁসরও আছে। কিন্তু সেই ছেলেটা নেই, যে তার ঢাকবাজিয়ে বাবার সাথে কাঁসর বাজাতে এসে আনমনে চারিদিকে দেখে, আর ভাবে, ওর বয়সী সবার নতুন জামা আছে, শুধু ওর কেন নেই!
প্রবাসের পুজোয় পাড়ার ছেলেরা চাঁদা চাইতে আসে না। আমাদের অনলাইন পেমেন্ট সফটওয়্যার আছে। শত্রুমিত্র নির্বিশেষে সবাই সবাইকে দেখলেই একটা কসমেটিক্স হাসি আছে! পলিটিক্যাল দাদাদের ভোটের টাকা দেওয়ার সময় কর্পোরেট কর্তারা ঠিক এই হাসিটাই হাসে। অথচ যেদিকে তাকাই, সেদিকেই ‘সব ঠিক হ্যায়’! কত জাঁক, কত জেল্লা, কত জমক! কিন্তু প্রবাসের পুজোয় সেই ময়নাপাড়ার মেয়েটি নেই, যে সস্তার পোশাক পরে, নতুন হাওয়াই স্যান্ডেলে ফোস্কা পড়া পায়ে মায়ের হাত ধরে পুজোমণ্ডপে এসে দাঁড়াবে। আর ভাববে, চারিদিকে এ সব কী? প্রবাসের পুজোয় চারপাশে শুধু জীবন্ত বুটিক, আর পি সি চন্দ্র’র শোকেস। যেন মানুষ নেই, সবাই মডেল। ওদের হাঁটার নাম ক্যাটওয়াক। ওরা আপনমনে সেলফি তোলে আর তোলায়। ওরা রাতেরবেলা কলকাতার আর্টিস্ট গাইতে এলে ‘হিন্দি হিন্দি’ বলে চেঁচায় এবং উদোম নাচে!
প্রবাসের ইন্ডোর পুজোপ্যান্ডেলের এককোণে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে উবু হয়ে বসে থাকে সেকেন্ড জেনারেশন। যদিও ওরা কিছু দেখতে বা শুনতে পায় না। ওরা কানে ‘ঠুলি’ গুঁজে শুধু সেল ফোন বা আই প্যাড দেখে। পুজোশেষে পুরোহিতের ধ্বনিটিরে প্রতিধ্বনি সদা ব্যঙ্গ করার মতো করে ওরা বলে,ইয়া ডেবি সার্ববুটেসু, ম্যাট্রিরুপেন সানস্টিটা! প্রবাসের পুজোয় প্যান্ডেলের পিছনে সেই আধো আঁধারের জেনারেটর জোন থাকে না, যেখানে গিয়ে সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা ছেলেরা জীবনে প্রথম সিগারেট খাবে। প্রবাসে সেই চুলে শ্যাম্পু করা, জীবনে প্রথম শাড়ি পরা মেয়েরা থাকে না, সমবয়সী ছেলেরা যাদের বলবে, রাতে ঠাকুর দেখতে যাবি? আর জবাবে ওই মেয়েরা বলবে, না রে, মা বকবে। প্রবাসের পুজোয় ঠাকুর দেখতে যাওয়ার কোনও সিনই নেই!
তবে বাঙালির তো শত ভঙ্গেও রঙ্গের শেষ নেই। এখনও পর্যন্ত আমেরিকায় বাঙালিদের দুর্গাপুজোর কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস রচিত হয়নি বটে। তবে বিভিন্ন মার্কিন বাঙালি সংস্থার ওয়েবসাইটে উল্লেখিত নথিপত্র থেকে জানা গেছে, আমেরিকায় এখন প্রায় ১২০টি দুর্গাপুজো হয় সাংগঠনিক ভাবে। আর আরও প্রায় ৩০টি পুজো হয় ছোট ছোট গোষ্ঠীর উদ্যোগে। আমেরিকায় ঐতিহ্য ও বহরে এগিয়ে থাকা পুজোগুলির মধ্যে, ‘সংস্কৃতি’ ও ‘কল্লোল’ ছাড়া উল্লেখযোগ্য হলো: নিউ ইয়র্ক কালী মন্দির, হিউস্টন দুর্গাবাড়ি, আটলান্টার বাগা, ন্যাশভিলের বিএজিএন, নর্থ ক্যারোলিনা বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন এবং ট্রাই স্টেট। শেষের পুজোটি যৌথভাবে করে তিনটি রাজ্য: ওহাইও, কেন্টাকি ও ইন্ডিয়ানাপোলিস। একেকবার একেক রাজ্যে পালা করে ওই পুজো হয়।
প্রবাসের পুজোয় তহবিল গঠনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আয়োজক সংগঠনের সদস্যচাঁদা যেমন থাকে, তেমনই থাকে কর্পোরেট স্পনসর কিংবা সরকারি অর্থ। পুজোর ক’দিন অনুষ্ঠানস্থলের প্রবেশদ্বারে প্রতিষ্ঠিত ট্রেজারি বেঞ্চ। চাঁদার বিনিময়ে প্রাপ্তি আয়োজকদের মুখপত্রের পুজোসংখ্যা। সঙ্গে আড্ডা ফাউ। আমাদের পুজো মানেই আড্ডার ‘ডোভার লেন’, চলছে তো চলছেই। সবজান্তা বাঙালির পরনিন্দা পরচর্চায় মিলেমিশে এক হয়ে যায় কাকদ্বীপ আর ক্যালিফোর্নিয়া! প্রবাসী পুজোর গর্ব আমাদের ‘কিচেন ক্যাবিনেট’! প্রসাদ থেকে পরমান্ন। ছোট বড়, কত যে ভোজ! এন্তার চা কফি। পান সিগারেট। মণ্ডা মিঠাই মোয়া মুড়কি নাড়ু। খিচুড়ি থেকে পায়েস। মাছের কালিয়া থেকে পাঁঠার মাংস। পোলাও থেকে বিরিয়ানি। পাপর বেগনী আলুভাজা। সুক্তো লাবড়া আলুরদম। লুচি ছোলার ডাল এবং অবশ্যই চাটনি। রান্নাবান্না হয় পুজোর জায়গাতেই। কখনো কেটারিং, কখনো আউটসোর্সিং। কখনো পালা করে হোম মেড।
সব মিলিয়ে আমরা বছরের ওই একটা সপ্তাহান্ত সব কিছু ভুলে সবাই একজোট হই। যে যার মতো ভক্তিভরে পুজো করি। কিংবা নাস্তিক হয়েও পুজোয় মিশে যাই! অন্তহীন আড্ডা দিই। একসাথে খাইদাই। সিঁদুর খেলা আর কোলাকুলি হয়। সাত সাগর তেরো নদীর পারে এ সব পাওয়া কি মুখের কথা! এই পুজো পুজো ভাবটা দেখতেই আমরা প্রবাসের পুজোয় যাই। সেই পুজো ফুরিয়েও যায় হরিপদ কেরানীর মাসমাইনের মতো। নিষ্ঠুর সোমবার কলকাতার প্রাইভেট বাসের কন্ডাক্টারদের মতো ‘জলদি নামুন, জলদি নামুন’ বলতে বলতে আমাদের প্রায় ঠেলে ফেলে দেয় অফিসের রাস্তায়। উৎসব তবুও বলে, শেষ পৃষ্ঠায় দেখুন! দেবীবরণের পর সিঁদুরখেলা। অবশেষে বিসর্জনের শোভাযাত্রা, সঙ্গে ধুনুচি নাচ। বাবুঘাটের ‘নকল’ ভাসান, পুজোর ঘট ঝপাং করে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ইনফ্ল্যাটেবল সুইমিং পুলের জলে। ঠিক যেভাবে অপু তার দিদি দুর্গার ‘চুরি করা’ হারটি ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল বাড়ির পাশের সবুজ পুকুরে।
তবে বিসর্জনের মাঝে কিছু অর্জনও থাকে বৈকি! প্রেমেও যেমন, পুজোয়ও তেমন। আমরা পরবাসীরা তো পুজোর ছলে সেই প্রেমেই মাতি! আমাদের দুর্গাপুজো হলো অনেক না পাওয়ার সাথে একটুখানি পাওয়া! ‘যার যাহা আছে তার তাই থাক, আমি থাকি চিরলাঞ্ছিত / শুধু তুমি এ জীবনে নয়নে নয়নে থাকো থাকো চিরবাঞ্ছিত’!

