স্নিগ্ধা চৌধুরী
আশ্বিন মাসের প্রতিপদে সূচিত হয় দেবীপক্ষ। এই দিনেই পূজিতা হন মহাশক্তির আদি রূপ, দেবী শৈলপুত্রী। সতীর দেহত্যাগের পর যিনি হিমালয়ের গৃহে কন্যারূপে আবির্ভূত হলেন, সেই নবজন্মই শৈলপুত্রী। তাই তিনি একাধারে সতীর পুনর্জন্ম, আবার শক্তির চিরন্তন উৎস। নামের অর্থেই লুকিয়ে আছে তাঁর পরিচয় শৈল অর্থাৎ পর্বত, পুত্রী মানে কন্যা, তিনি পর্বতের মতোই দৃঢ়, অটল, অচল এবং অনন্ত শক্তির আধার।
শৈলপুত্রীর রূপ শান্ত অথচ তেজোময়। তাঁর শরীরে শ্বেতবস্ত্র, যা নির্মলতার প্রতীক। বাহন নন্দী, যা ধর্ম ও ভক্তির প্রতীক। এক হাতে ত্রিশূল, যা দানবসংহার ও অশুভ বিনাশের দ্যোতক, আর অন্য হাতে পদ্ম, যা প্রসবশক্তি ও সৃষ্টির চিহ্ন। এই দ্বৈত রূপেই দেবী প্রকাশ করেন মাতৃত্ব ও মহাশক্তির মেলবন্ধন। তাঁর স্নেহময়ী চেহারার অন্তরালে লুকিয়ে থাকে অসীম তেজ, যা দুঃখ-দুর্দশা দূর করে জগৎকে রক্ষা করে।
পুরাণে বর্ণিত আছে তাঁর বীরত্বের কাহিনি। তারকা রাক্ষসী দেবলোকে ভয় ছড়ালে দেবী শৈলপুত্রী সেই অশুভ শক্তিকে বধ করেন। পিতৃহৃদয় হিমালয় কন্যার বীর্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে শৈলপুত্রী উপাধি দেন। সেই কাহিনি আজও স্মরণ করিয়ে দেয়, দেবী কেবল মায়া ও মমতার প্রতীক নন, তিনি ভয়ঙ্কর শক্তির আধারও বটে। শৈলপুত্রীর এই রূপেই লুকিয়ে আছে নারীসত্তার অন্তর্লীন সাহস, যা প্রয়োজনে পর্বতের মতো অটল ও অদম্য হয়ে ওঠে।
নবরাত্রির প্রথম দিনে শৈলপুত্রীর আরাধনা মানে ভক্তির সঙ্গে সঙ্গে আত্মশক্তিরও জাগরণ। ভোরবেলা স্নান-ধ্যান শেষে ঘটে স্থাপন করে তাঁর ধ্যান করলে অন্তরে জন্ম নেয় শান্তি, ধৈর্য ও আস্থার বীজ। বিশ্বাস করা হয়, এই পূজার মাধ্যমে ভক্ত লাভ করেন যশ, মোক্ষ এবং সৌভাগ্য। আবার অনেকে মনে করেন, শৈলপুত্রীর কৃপায় মেলে মনের মতো জীবনসঙ্গী। তাই নবরাত্রির সূচনালগ্নে তাঁর পূজা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, জীবনের গভীরে সাহস, ভক্তি ও মমতার সংহতি ঘটায়।
দেবী কবচে ঘোষিত হয়েছে, “প্রথমং শৈলপুত্রী” অর্থাৎ দেবীর নয়টি রূপের প্রথম স্থানে তিনি। তাঁর মাধ্যমেই শুরু হয় শক্তিসাধনা, তাঁর মাধ্যমেই জাগে অন্তর্লীন মহাশক্তি। তিনি আদি প্রকৃতি, তিনি সৃষ্টির মাতা, তিনি মহাশক্তির মূল উৎস। প্রতিপদের এই পূজা তাই শুধু এক দেবীচরিত স্মরণ নয়, বরং মানুষের অন্তরে সাহস, শক্তি ও মাতৃত্বের জাগরণের এক মহামন্ত্র।
শৈলপুত্রী হলেন শক্তির আদিগাথা, যেখানে স্নেহময়ী মায়ের কোমলতা আর দানববধিনী দেবীর তেজ একাকার। প্রতিপদের পূজায় তাই সমগ্র ভক্তসমাজ কেবল দেবীর আরাধনা করে না, বরং নিজেদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই অটল শক্তিকে আহ্বান জানায় যা অন্ধকারে আলোক আনে, অশুভকে বিনাশ করে, শুভকে প্রতিষ্ঠিত করে।
