জলভরা মেঘ সরিয়ে নীল আকাশে সূর্য উঁকি দিতেই চওড়া হাসি দুশ্চিন্তায় কুঁকড়ে থাকা মুখগুলিতে। অনেকটা যুদ্ধকালীন প্রস্তুতিতে চলছে ক্ষতিগ্রস্ত প্যান্ডেল সহ প্রতিমার মেরামতির কাজ। কলকাতার বেশিরভাগ সর্বজনীনের পুজো উদ্বোধন পর্ব এখনও হয়নি। সে কারণেই দিনরাত এক করে কাজে ব্যস্ত ডেকরেটরের কর্মীবৃন্দ থেকে শুরু করে আর্টিস্ট এবং ইলেকট্রিশিয়ানরা। মণ্ডপ প্রাঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা যাবতীর আর্বজনা সাফসুতরো করার কাজে হাত লাগিয়েছেন পুজো উদ্যোক্তারাও।
কলকাতার বেশিরভাগ সর্বজনীনে ষষ্ঠীর বোধন রবিবার। তাই তার আগেই গোটা মণ্ডপ সহ প্রতিমার যাবতীয় সাজসজ্জা সম্পূর্ণ করাই লক্ষ্য। ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের সম্পাদক শাশ্বত বসু বলছেন, সোমবার রাতের মুষলধারে বৃষ্টির জেরে যাবতীয় ক্ষয়ক্ষতি মিটিয়ে ফেলা সম্ভব হবে যদি এমন রোদ ঝলমলে আকাশ থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ক্ষত অনেকটাই সারিয়ে ফেলতে পারবে কয়েক ঘণ্টার রোদ। কলকাতায় ফোরাম দুর্গোৎসবের সদস্য ৪৫০টি সর্বজনীন।
এবারের পুজোয় কমবেশি ২০,০০০ বর্গফুটের প্যান্ডেল করেছে বেহালার নতুন দল। পুজো উদ্যোক্তারা রাজস্থান এবং দক্ষিণ ভারতের স্থাপত্য এবং মুঘল প্রভাবের সমন্বয়ে ‘শিবাণী ধাম’ চিত্রিত করেছে। বুধবার থেকেই এখানকার ডেকরেটরের কর্মীরা প্রায় ৩০ ফুট উঁচু কাঠামোতে উঠে মেরামতের কাজ সম্পন্ন করেছেন। বেহালা নতুন দল পুজো কমিটির এক সদস্য বলেন, “দেবীর কৃপায় আবহাওয়ার উন্নতি হয়েছে এবং আমরা মেরামত সম্পূর্ণ করতে পেরেছি। যদিও আরও বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা কিন্তু রয়েছে। তবে আমরা সকলেই আশা করছি, গত মঙ্গলবারের মতো পরিস্থিতি আর তৈরি হবে না”।
বেহালা আদর্শ পল্লিও বুধবারেই তাদের বকেয়া সব কাজ সম্পূর্ণ করেছে। “একটানা ভারী বৃষ্টিতে মণ্ডপসজ্জার কিছু শিল্পকর্ম নষ্ট হয়েছিল। আমরা তা মেরামত করেছি।” কালীঘাটের নেপাল ভট্টাচার্য স্ট্রিটের প্যান্ডেল এবং প্রতিমাও এখন সেজেগুজে তৈরি। গোটা মঙ্গলবারই একরকম জলমগ্ন ছিল এই পুজোমণ্ডপ। শিল্পীর দল এবং ডেকরেটরের কর্মীরা বুধবার প্রায় সারাদিন যাবতীয় মেরামতির কাজে হাত লাগিয়েছিলেন।
নলিন সরকার স্ট্রিটে বুধবার ভোরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের মেরামত সম্পন্ন হয়েছে। পুজোর উদ্যোক্তারা বলছেন, “প্যান্ডেল শুকোনোর জন্য আমাদের এখন কেবল চার-পাঁচ ঘণ্টা একটানা রোদের প্রয়োজন”। কাশী বোস লেন পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক সৌমেন দত্ত বলেন, “ক্লাবের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করেছেন এবং ১২ ঘণ্টার মধ্যে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত গোটা এলাকাটি একরকম সাজিয়ে গুছিয়ে আগের অবস্থায় ফেরাতে সক্ষম হয়েছেন।”
চালতাবাগানের দুর্গামণ্ডপের ভেতরে বুধবার বিকেল পর্যন্ত জল জমে ছিল। কেএমসির একটি পাম্প বসিয়ে জমা জল বের করা হয়। পুজো কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা ভিজে যাওয়া আসবাবপত্র সরাতে এবং ভেজা মেঝে পরিষ্কার করতে হাত লাগিয়ছেন। জমা জল নেমে যাওয়ার পরে সবকিছু পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্তও করেছেন পুজো কমিটির সদস্যরা।
কানাই ধর লেনের আদিবাসী বৃন্দের পরিস্থিতিও চালতাবাগানের মতো ভয়াবহ ছিল। জমে থাকা জলে মণ্ডপের অন্দরসজ্জার বেশ কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া জমা জলের কারণেই আলোর কাজ করা হয়নি। অথচ শুক্রবারই রয়েছে এই পুজোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। সেই কারণে কাজ চলছে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে।
কুমোরটুলি পার্কের মণ্ডপে সরিয়ে ফেলা হয়েছে জমা জল। দর্শনার্থীদের নিরাপদ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য এখানে কাঠের ‘ওয়াকওয়ে’ তৈরি করা হয়েছে। বুধবার সন্ধের মধ্যে তা সম্পূর্ণ করা হয়। টানা ভারী বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কলেজ স্কোয়ারের পুজোও। তবে আয়োজক কমিটির এক সদস্য আশ্বস্ত করে বলেছেন, তাঁদের শিল্পী ও কর্মীরা ইতিমধ্যে সেগুলির মেরামতির কাজে হাত লাগিয়েছেন। পুজো উদ্বোধনের আগেই সব কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে তাঁদের প্রত্যাশা।
